চট্টগ্রামে বন্যায় পানিবন্দি ১০ লক্ষাধিক মানুষ

আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম:

চার দশকের রেকর্ড বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম। নগরীর জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও উপজেলাগুলোয় চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সাঙ্গু, ডলু, ফেনী, হালদা নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে লোকালয়ে বইছে পানির স্রোত। ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন।

তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে গত তিনদিনে নারী-শিশুসহ আট জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের গৃহপালিত পশু, পুকুরের মাছ, খামার ভেসে গেছে পানিতে। স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, মৌসুমী বায়ু ও উজানের ঢলে দেশের দক্ষিণ পূর্ব ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদীর বান্দরবান পয়েন্টে ৯৫ সেন্টিমিটার ও দোহাজারী পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া মাতামুহুরী নদীর লামা পয়েন্ট ৪৭ সেন্টিমিটার ও চিরিঙ্গা পয়েন্ট ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রামসহ দেশের আট বিভাগে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দুইদিনে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২-৫’শ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির আভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সমুদ্র বন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের উপজেলাগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সব উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।’

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যা কবলিত মানুষকে উদ্ধার ও খাবার পৌঁছে দিতে স্পিডবোটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২’শ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। আরো বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। দুর্গতদের সেখানে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও সন্দ্বীপ উপজেলা। এসব উপজেলার অধিকাংশ এলাকাই পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও বুক সমান, কোথাও কোমর সমান পানির কারণে মানুষ গৃহবন্ধী হয়ে আছে। এর বাইরেও বোয়ালখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, প্রায় ৫ লাখ জনসংখ্যার এই উপজেলার অধিকাংশ গ্রামই পানির নিচে। পানির স্রোতে বঙ্গোপসাগরের তীরে নির্মিত বেড়িবাঁধের অনেকাংশ ভেঙ্গে যাওয়ায় জোয়ারের সময় পানির তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে। আবার সাঙ্গু নদী দিয়ে অনবরত পাহাড়ী ঢলের পানি এসে পুরো উপজেলাকে প্লাবিত করেছে। গণ্ডামারা, পুঁইছড়ি, ছনুয়াসহ উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানির উচ্চতা ৮-১০ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। বন্যার স্রোতে চট্টগ্রাম-বাঁশখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে গিয়ে যান চলাচল চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

পাশের উপজেলা সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, সাতকানিয়া উপজেলার ৭০ শতাংশের অধিক এলাকা বন্যা কবলিত। সামর্থ্য থাকার পরও অনেকে পযাপ্ত খাবারের যোগান পাচ্ছেন না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৪ ঘন্টার কন্ট্রোল রুম চালু করে সার্বক্ষনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি অনেকে বেসরকারিভাবেও অনেকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছেন।

বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, বোয়ালখালীর অধিকাংশ এলাকাও বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী মানুষ চরম সংকটে আছে। টানা ৪-৫ দিনের বৃষ্টিতে চুলা বন্ধ হয়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের সংকট তুলনামূলক বেশি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো রান্না করা ও শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ঢলে ভেসে গেলো দুই শিশু: বাঁশখালী উপজেলার বাহারছাড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামের দুই শিশু পাাহাড়ী ঢলে ভেসে গেছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পৃথক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে আশিক ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের কামাল উদ্দিনের পুত্র। মিরাজ রত্নপুর এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার সকাল ১১টায় দুই শিশু নিজ নিজ বাড়ির উঠানে খেলছিলো। এসসয় পূর্বদিক থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় তারা ভেসে যায়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এই দুই শিশুসহ চট্টগ্রাম নগর, আনোয়ারা, রাউজান ও হাটহাজারীতে পাহাড়ী ঢল, পাহাড়ধ্বস, দেয়াল ধ্বস ও বন্যার পানিতে গত তিনদিনে মোট আট জনের মৃত্যু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights