চিপ পাচারের অর্থে গড়া বিলাসবহুল প্রাসাদ জব্দ করলো সিঙ্গাপুর

অনলাইন ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এনভিডিয়া চিপ পাচারের অর্থে কেনা একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ জব্দ করেছে সিঙ্গাপুর পুলিশ।

অর্থপাচার ও প্রতারণার অভিযোগে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে প্রায় ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৫৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫২৫ কোটি টাকারও বেশি) মূল্যের ওই সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে।

বুধবার সিঙ্গাপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, প্রাসাদটি সর্বশেষ ৫৫ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে বিক্রি হয়েছিল। তদন্তে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, এর ক্রয়মূল্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ অবৈধভাবে অর্জিত আয় থেকে পরিশোধ করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকা এনভিডিয়ার অত্যাধুনিক এআই চিপ সংবলিত সার্ভারের অবৈধ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই এ তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব সার্ভার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে গোপনে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছিল।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সিঙ্গাপুরকে এমন অবৈধ চালান চীনে পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

তদন্ত চলাকালে যাতে সম্পত্তিটি বিক্রি বা হস্তান্তর করা না যায়, সেজন্য আদালতের নির্দেশে প্রাসাদটির ওপর বিক্রিনিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত বোটানিক গার্ডেনসের অদূরে অবস্থিত প্রাসাদটি শহরভিত্তিক-রাষ্ট্রটির অন্যতম অভিজাত ও ব্যয়বহুল এলাকায় অবস্থিত।

এ মামলায় অভিযুক্তদের একজন ওয়েই ঝাওলুন, যিনি অ্যালান ওয়েই নামেও পরিচিত। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি অ্যাপেরিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সার্ভার ও প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহ করে থাকে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত প্রায় ৩৮ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার ব্যবহার করে তিনি ওই বিলাসবহুল বাড়িটি কিনেছিলেন। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করা হবে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে অ্যাপেরিয়া গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ১০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারও জব্দ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওয়েইসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থপাচার এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের কর্মরত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে- এমন ভুয়া তথ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উন্নতমানের সার্ভারের অর্ডার দেন। তবে ওই সার্ভারগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, আলোচিত সার্ভারগুলো তিনটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান- ডেল, সুপার মাইক্রো কম্পিউটার এবং আসুস- এর কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত চারজনের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

এছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লাক্সারিয়েট ইয়োর লাইফ এবং অ্যাপেরিয়া গ্রুপের অধীন আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি, চলমান তদন্তে এই প্রথম কোনও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করা হলো।

সিঙ্গাপুর পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি রয়েছে। দেশটিকে একটি বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখতে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং চীনের সামরিক খাতে উন্নত এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকাতে এনভিডিয়ার উন্নত চিপ রফতানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে এসব চিপের অবৈধ পাচার ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করেছে।

২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত চিপ সংবলিত সার্ভারের কিছু চালান দেশটির মাধ্যমে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে এনভিডিয়ার কয়েকটি সেমিকন্ডাক্টর চীনে বিক্রির অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights