জঙ্গিবাদের নতুন ছায়া ও কিছু কথা

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ফিরে আসছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন আর কেবল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকার দিকে তাকালে চলবে না। আরও গভীরে তাকাতে হবে। কারণ জঙ্গিবাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় সব সময় বোমা বিস্ফোরণের মুহূর্ত নয়। তারও আগে আসে সংগঠন গড়ে ওঠা, জনসমর্থন তৈরি, মতাদর্শ ছড়ানো এবং রাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে নেওয়া।

১০ আগস্ট জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS) বাংলাদেশকে ব্যবহার করে এখানে সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে এই আশঙ্কার তাৎপর্য যেন হিমবাহের চূড়া দেখার মতো, যার গভীরে রয়েছে অনেক না-দেখা বার্তা। এটা বিশেষভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো যখন কোনো দেশে একটি বৈশ্বিক জঙ্গি সংগঠনের সাংগঠনিক বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করে, তখন সেটিকে কেবল আরেকটি নিরাপত্তা সতর্কতা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।

বাংলাদেশে অবশ্য এর আগেই কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। ২০২৬ সালের জুনে পুলিশ সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছিল। গত বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ১২ আগস্ট ঢাকার সাভারে একটি হাতে তৈরি প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার হয়েছে। এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে রাখলে ছবিটি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।

তবে কি পুরোনো জঙ্গিবাদ, নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসতে চাইছে? প্রকৃত অর্থে, বাংলাদেশের জঙ্গিবাদকে এক নামে চেনা যায় না। জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট নব্য জেএমবি (Neo-JMB) এবং আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত আনসার আল ইসলাম (AAI)। এই তিন ধারার সামাজিক ভিত্তি ও কার্যপদ্ধতির মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের সাম্প্রতিক গতিপথ বোঝার জন্য AQIS-সংশ্লিষ্ট AAI-এর উত্থানের কারণ বুঝতে হবে। ইসলামিক স্টেটের কথিত খেলাফত ভেঙে পড়ার পর Neo-JMB তার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হারায়। আবু বকর আল-বাগদাদির মৃত্যু এবং ভূখণ্ডগত খেলাফতের পতন তরুণদের কাছে সেই বৈশ্বিক স্বপ্নের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দেয়। ফলে Neo-JMB-এর আকর্ষণও কমে যায়। এই জায়গাটিই AQIS কাজে লাগিয়েছে। AAI-এর উত্থান দ্রুত নয়। কিন্তু তার গতি ধীর এবং ধারাবাহিক। এর একটি বড় উদাহরণ মাহমুদুল হাসান গুনোবি। ২০২১ সালে বাংলাদেশের সংসদকে লক্ষ্য করে কথিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০২৪ সালে তিনি খালাস পান। এরপর তিনি আবার জনসমক্ষে সক্রিয় হন। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ফেসবুক অনুসারীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি। তিনি ‘গ্লোবাল জিহাদ’ ও ‘খেলাফত’-এর কথা বলেন এবং বাংলাদেশে ‘তালেবানি শাসন’-এর পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন।

জঙ্গিবাদ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী সংগ্রহ করতে পারে, তখন তাকে কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সংগঠনের শক্তি তার অস্ত্রের সংখ্যায় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি তার অনুসারী তৈরির ক্ষমতায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সম্ভবত AQIS-এর কৌশলগত পরিবর্তন। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের পর AQIS-এর নেতা উস্তাদ উসামা মাহমুদ বাংলাদেশের ‘ধর্মীয় সমাজের’ উদ্দেশে একটি বার্তা দেন। সেখানে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দাওয়াহ বা ব্যাপক ধর্মীয় প্রচারকে প্রধান হাতিয়ার করা, প্রতিরোধ ও বিপ্লবের সক্ষমতা তৈরি করা, সেই সক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রের ওপর বাইরে থেকে সংস্কারের চাপ সৃষ্টি করা এবং সরাসরি সরকারে যাওয়ার চেষ্টা না করা। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। অর্থাৎ AQIS এখনই রাষ্ট্র দখলের জন্য ছুটছে না। তারা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে চায়। মানুষের মধ্যে নিজেদের ধারণা ঢুকিয়ে দিতে চায়। রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে সমাজের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

এই কৌশলকে হালকা করে দেখার কারণ নেই। বরং ধীর গতি এখানে বিপদের একটি কারণ। দ্রুত হামলা হলে রাষ্ট্র সতর্ক হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মতাদর্শ ছড়ালে সমাজ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কখন তার ভেতরে পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

AQIS-এর আরেকটি সুবিধা হলো তারা এমন কিছু প্রশ্নকে নিজেদের প্রচারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যেগুলোর সামাজিক আবেদন ইতিমধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা, কাশ্মীর, ভারতে মুসলমানদের পরিস্থিতি, গাজা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ভেতরে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নানা বিতর্ক তাদের প্রচারের উপাদান। AQIS-এর বাংলা ও ইংরেজি প্রচারসামগ্রী দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগকে ধর্মীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রের ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত করে আসছে।

এখানে রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা আছে। মানুষের বাস্তব ক্ষোভকে অবহেলা করলে সেই ক্ষোভ অন্য কেউ নিজের মতাদর্শের জন্য ব্যবহার করবে। রোহিঙ্গা সংকটের ন্যায়সংগত সমাধান চাইলে সেটি জঙ্গিদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি থাকলে সেটিও জঙ্গি প্রচারণার সম্পদ হতে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রকে মানুষের ন্যায়সংগত ক্ষোভের রাজনৈতিক ও মানবিক ভাষা তৈরি করতে হবে।

এখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগে জঙ্গিবাদকে অস্বীকার করা হয়েছে। জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের অজুহাত করা যাবে না। আবার রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব অস্বীকারও করা যাবে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, বাস্তবতার স্বীকারোক্তি।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আছে কোন পর্যায়ে? এর চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তার সামাজিক ভিত্তি কতটা বাড়ছে, কোন সংগঠন কীভাবে তরুণদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কারা অর্থ ও প্রচার জোগাচ্ছে এবং রাষ্ট্রের কোন দুর্বল জায়গাগুলো তারা কাজে লাগাচ্ছে।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা তাই আতঙ্ক সৃষ্টির কারণ হওয়া উচিত নয়। এটি একটি আগাম সংকেত। সেই সংকেতকে উপেক্ষা করলে বিপদ বাড়বে। আর গুরুত্ব দিয়ে শুনলে হয়তো বাংলাদেশ এবার সেই পুরোনো ভুলটি এড়াতে পারবে, যেখানে রাষ্ট্র প্রথমে জঙ্গিবাদকে অস্বীকার করে, পরে তাকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়, এবং শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে যে আগুনটি তার নিজের ঘরেই পৌঁছে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights