জন-আস্থা ধরে রাখতে হবে বিএনপিকে
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
আজ ১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিএনপির যাত্রা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেই অনুধাবন করা যায়, কেন অল্প সময়ের মধ্যে এটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিএনপিকে মানুষের প্রথম পছন্দের রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই সময় সদ্য স্বাধীন দেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। মোটাদাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল দুইটি। প্রথমত, দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু করা। অর্থাৎ মানুষ তাদের পছন্দনীয় রাজনৈতিক দলের হাতে দেশ শাসনের দায়িত্বভার অর্পণ করবে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, মানুষের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ।
১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে এই অঞ্চলের মানুষ আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। দলটি এ দেশের মানুষকে গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসক চক্র বিজয়ী দলের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ না করায় মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর আগে সামরিক গণ্ডির বাইরে দেশের মানুষের কাছে জিয়াউর রহমানের তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না, থাকার কথাও নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান তাঁর কর্মস্থল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে যান। দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকারী আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক উপায়ে দেশ পরিচালনা করবে। কিন্তু দেশের মানুষের আশাহত হতে বেশি সময় লাগেনি।
মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামী লীগের হাতে গণতন্ত্র কখনোই নিরাপদ নয়, এটা দলটি বারবার প্রমাণ করেছে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। লাখ লাখ মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়। সেই সময় দেশে খাদ্যের তেমন কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু সরকারদলীয় লোকজন খাদ্য পাচার করে দেশকে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কবলে ঠেলে দেয়। এমনি এক অবস্থায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠন করেন। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। ঘোষণা করা হয় দেশে বাকশাল ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না। দেশ গণতন্ত্রহীনতার দিকে ধাবিত হয়। সেই সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সারা দেশে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। জাসদের ক্যাডারদের হাতে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী প্রাণ হারান। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রক্ষী বাহিনীর হাতে জাসদের অনেক কর্মী নিহত হন। দেশ এক ভয়াবহ অবস্থায় পতিত হয়। এমনি এক অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হন। আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সেই সরকারও স্থিতিশীল হতে পারেনি। একই বছর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমানকে অন্তরীণ করা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যরা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান এবং জিয়াউর রহমানের অন্তরীণ কোনোভাবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা পাল্টা অভ্যত্থান ঘটিয়ে ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেন। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে তাঁর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করে। সেনাবাহিনীর মধ্যে জিয়াউর রহমানের অসম্ভব জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনীতে ‘চেইন অব কমান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য জিয়াউর রহমান উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, দেশে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা না গেলে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। তাই তিনি সব দলমতের মানুষের সমন্বয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই ফলশ্রুতি হচ্ছে বিএনপি।
পৃথিবীর ইতিহাসে সেনাবাহিনী থেকে অনেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছেন। তাঁরা নন্দিত অথবা নিন্দিত হয়েছেন। কিন্তু সেনাবাহিনী থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কোনো সেনা কর্মকর্তা দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছেন এমন নজির বিশ্বে বিরল। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি যদি দেশের কল্যাণে আর কোনো কাজ না করতেন তাহলেও স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকতেন। দেশের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান সব সময় সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সংবিধানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করেন। এর আগে সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ যুক্ত করায় কোনো কোনো মহলের কাছে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের কখনোই বাঙালি মনে করে না। তাই তারা রাষ্ট্রঘোষিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি। ব্যক্তি কখনোই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হতে পারে না। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা নিজেদের সংকীর্ণ গণ্ডির বাইরে গিয়ে দেশ ও দলের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তেমনি ব্যক্তিত্ব, যাঁরা সংকীর্ণ দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতির জন্য অবদান রেখে গেছেন।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার মতো দুজন দূরদর্শী এবং প্রাজ্ঞ নেতার নেতৃত্ব লাভ করেছিল। যে কারণে বিএনপি দেশের শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশের এক ক্রান্তিকালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেছিল। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দেশের সব রাজনৈতিক দল তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করেছে। বিএনপি সব সময়ই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এই নীতিতে বিশ্বাসী।
স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সাফল্য অর্জন করেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন ওআইসির পক্ষ থেকে যে মধ্যস্থতাকারী দল গঠন করা হয় জিয়াউর রহমান ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। তৎকালীন বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে সফলতা অর্জন করে। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সময় যে ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ যুক্ত ছিল। ফলে শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানির হিস্সা পেত।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। জিয়াউর রহমান দেশে রপ্তানি প্রক্রিয়া অঞ্চল গঠন করেন। আঞ্চলিক জোট সার্ক গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগ তিনি শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের আমলেই। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রাইভেট সেক্টরকে উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রাইভেট সেক্টর বিকাশের এই ধারা অব্যাহত রাখে। এমনকি আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপির প্রাইভেট সেক্টর বিকাশের মাধ্যমে শিল্পায়নের ধারা অব্যাহত রাখে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এবং তার আগে সেনাশাসিত তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের দুই বছর বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনবারের নির্বাচিত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে জোর করে ‘এক কাপড়ে’ বের করে দেওয়া হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে প্রায় পঙ্গু করে ফেলা হয়েছিল। তাঁকে লন্ডনে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। বিগত সরকারের আমলে বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর নির্যাতন যত বৃদ্ধি করা হয়েছে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের জনপ্রিয়তাও ততই বেড়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে নির্বাসনে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হলেও তিনি তাতে সম্মত হননি। তিনি বলেছেন, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। তাই আমি দেশের বাইরে যাব না। আওয়ামী লীগ আমলে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হলেও কোনো গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এটা অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কিন্তু গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা জ্ঞাপন করেছে। বিএনপি এবং তার নেতা তারেক রহমানের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার পাল্লাটা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। বিএনপি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এখনো সাত মাস পূর্ণ হয়নি। এই অল্প সময়ে একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা যায় না। বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, তাদের প্রতি জনগণের ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। আর তাই তাদের ওপর জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আন্তরিকভাবে জনপ্রত্যাশা পূরণে চেষ্টা চালাতে হবে। চাটুকাররা নানাভাবে সরকারের প্রশংসা করে ফায়দা লুটে নেওয়ার চেষ্টা করবে। এদের থেকে সতর্কতার সঙ্গে দূরে থাকতে হবে। প্রতিটি সমস্যার গভীরে গিয়ে তার স্বরূপ অনুসন্ধানের চেষ্টা করতে হবে।
উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকারের ওপর এমন কিছু সমস্যা এসে পড়েছে যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে প্রায় চার বছর ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ খুবই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে দারিদ্র্য বিমোচনের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় পরিচয়ে চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাসের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সূচনালগ্নেই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিক্ষা, প্রশাসন সর্বত্রই দলীয়করণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের পরিণতি কী হতে পারে, তা আমরা নিকট অতীতে প্রত্যক্ষ করেছি। বিদ্যুৎসংকট সমাধানে কার্যকর চেষ্টা চালাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, খতিয়ে দেখতে হবে। সমস্যা যেভাবেই সৃষ্টি হোক না কেন, তা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই সমস্যাকে দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যাবে না। বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের ওপর দৃষ্টি রাখতে হবে। তারা সুযোগ পেলেই সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাতে পারে। মনে রাখতে হবে, আমলাতন্ত্রের প্রশ্নাতীত সহায়তা না পেলে একটি জনপ্রিয় সরকারের পক্ষেও সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। আর সব ক্ষেত্রেই সময়ের কাজ সময়ে সম্পন্ন করতে হবে।
উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকারের ওপর যেসব জটিল সমস্যা এসে পড়েছে তা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। এজন্য কাউকে দোষারোপ করলে লাভ হবে না। সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করছে এবং করবে কিন্তু তার একটি সীমা আছে। সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে একসময় জনগণ সরকারের প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপিত হয়েছে, কর্মদক্ষতা দিয়ে তা অটুট রাখার চেষ্টা করতে হবে। যে পর্যায়েই সমস্যা সৃষ্টি হোক না কেন, তা যদি সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে তার ‘দায়’ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ওপরই বর্তাবে। দিন শেষে বলা যাবে, বর্তমান সরকার গণপ্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হয়েছে। এমনভাবে দেশ পরিচালনা করতে হবে, যাতে অতীতের সেই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আর ফিরে না আসে।
♦ লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্তমানে প্রফেসর, ইমেরিটাস, ঢাবি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত
