জলুস হারাচ্ছে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ
ইমরান এমি, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে এক সময়ের জনপ্রিয় ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস। ১৯৮৭ সালের ১৪ এপ্রিল চালু করা এ ট্রেনটি ছিল রেলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যাত্রী ও রাজস্ব আয় করা ট্রেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় জনপ্রিয় রেল রুট লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন এখন মৃতপ্রায়। জরাজীর্ণ রেলপথ সংস্কারে অনীহা, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা প্রণয়ন না করা, পুরোনো ট্রেনগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি নতুন কোচ সংযোজনে অনীহা, পিক আওয়ারের ট্রেন বন্ধ করায় নাজুক হয়ে পড়েছে বরিশাল বিভাগ ও দেশের মধ্যাঞ্চলের লঞ্চমুখী যাত্রীদের জনপ্রিয় রেলপথ লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের প্রতি রেলের উদাসীনতার কারণে এই রুটের ট্রেনগুলো থেকে আগ্রহ হারিয়েছেন যাত্রীরা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকাসহ আশপাশের যাত্রীরা সড়কপথে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত করলেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুরের যাত্রীদের কাছে এখনো জনপ্রিয়তা রয়েছে চাঁদপুরের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাক্সিক্ষত ট্রেন সার্ভিস না থাকার কারণে মানুষ বাড়তি খরচ সত্ত্বেও ঢাকা হয়ে পদ্মা সেতু ব্যবহার করে যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ সরকার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠনের পর ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ১৫০ কিলোমিটার এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৬৯ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ উদ্বোধন করে। চাঁদপুর হয়ে দেশের মধ্যাঞ্চল ও মধ্য দক্ষিণাঞ্চলে নৌপথে যাতায়াত সহজ ও দ্রুত হওয়ায় লাকসাম-চাঁদপুর রুটটি ওই সময় থেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যাত্রীদের কাছে। তবে রেলপথ স্থাপনের পর থেকে শতবর্ষী রেলপথটির কোনো সংস্কার না হওয়া, নতুন ট্রেন চালু না করায় এককালের জনপ্রিয় রেল রুটটি সবচেয়ে বেশি যাত্রীখরা ও লোকসানের মুখে পড়েছে। একসময় চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, কুমিল্লা-চাঁদপুর, লাকসাম-চাঁদপুরে প্রতিদিন চলাচল করত ১০-১২ জোড়া ট্রেন। নোয়াখালী থেকে প্রতিদিন তিন জোড়া ট্রেন লাকসাম পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করত। এই তিন জোড়া ট্রেনের যাত্রীদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য ছিল লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের বিভিন্ন স্টেশন। তবে ক্রমান্বয়ে বন্ধ হতে হতে চাঁদপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করে মাত্র দুই জোড়া ট্রেন। একটি মাত্র আন্তনগর ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস (চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম) ছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে সাগরিকা কমিউটার নামের একটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন চলাচল করে।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেন ৬৯ হাজার ৮৪১ যাত্রী পরিবহন করে আয় করেছে ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৮২ টাকা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ট্রেনটি ৭৪ হাজার যাত্রী পরিবহন করে ১ কোটি ৫ লাখ ৭৪ হাজার ১৭৩ টাকা আয় করেছিল। যদিও সর্বশেষ আগস্টে এই ট্রেনটি ১৭ হাজার ৬০৫ যাত্রী পরিবহনে আয় করেছে ২৮ লাখ ২০ হাজার ৬০৭ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৫৬ হাজার ২৫৮ যাত্রী থেকে আয় করেছে ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৬৪ টাকা। কভিড-১৯ এর আগেও ১৮/৩৮ লোডের মেঘনা এক্সপ্রেস থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা আয় করত রেলওয়ে। এদিকে গত দেড় দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪০৭টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ করে বিভিন্ন আন্তনগর ট্রেনে সংযোজন করেছে। আবার বিদ্যমান ট্রেনগুলো থেকে মুক্ত হওয়া কোচ/রেকগুলো অপরাপর ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা একমাত্র আন্তনগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেন চলছে পুরোনো পিএইচটি টাইপ কোচ দিয়ে। ১৮/৩৬ লোডের ট্রেনটিকে শোভন চেয়ার, শোভন, প্রথম শ্রেণির চেয়ার ও প্রথম শ্রেণির কেবিন আসনের কোচ দিয়ে চালানো হয়। পূর্বাঞ্চলের অনেক অগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনেও নতুন কোচ সংযোজন হলেও চাঁদপুরগামী ট্রেনগুলোতে পুরোনো জীর্ণশীর্ণ কোচের পাশাপাশি সবচেয়ে কম গতিসম্পন্ন লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছে। এমনটি নতুন কোচ সংযোজনের পর অবমুক্ত হওয়া কোচগুলোও চাঁদপুর রুটের মেঘনা কিংবা সাগরিকা কমিউটার ট্রেনে যুক্ত করছে না রেলওয়ে। সার্বিক বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
