জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি

আকতারুজ্জামান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেছেন, ‘এ দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯৯২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রত্যাশা ছিল দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর। কিন্তু গত ৩৪ বছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, কলেজগুলোর গুণগত পরিবর্তন, শিক্ষকদের মান বাড়ানো, যুগোপযোগী সিলেবাস তৈরি, পড়াশোনার সঙ্গে চাকরির সংযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ অবস্থায় আজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে ড. এ এস এম আমানুল্লাহ আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে দেশের কলেজগুলোতে শিক্ষার মান বাড়েনি। ছাত্রছাত্রীদের মোটিভেশন দেওয়ার মতো কিছু তৈরি হয়নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রজেক্ট এসেছিল, সেই টাকাটা খরচ করা হয়েছে। এতে বেশ কিছু কলেজে কাঠামোগত কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব অপ্রতুল।’ তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচণ্ড সেশনজট ছিল। আমি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও বিভাগভেদে দুই থেকে সাড়ে তিন বছর জট ছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘চলতি বছর শিক্ষার্থীদের আটটি চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে। এ পরীক্ষা হলে ডিসেম্বরের মধ্যে আশি শতাংশ সেশনজট লাঘব হবে। আগামী বছরের জুন নাগাদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট থাকবে না বলে প্রত্যাশা করছি।’

এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ দেশের সব থেকে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ৭০ ভাগ উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে পেলাম এর একাডেমিক সিলেবাস আসলে বেকার তৈরির কারখানা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোথাও চাকরি পাচ্ছে না। এটা দেখার পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কীভাবে চাকরির উপযুক্ত করে তোলা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করি। এখানে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে না, তাদের ক্লাসে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছি। কলেজগুলোতে গভর্নিং বডিগুলোর অবস্থা ছিল ভয়াবহ। আমরা গভর্নিং বডির নীতিমালাও কিছুটা পরিবর্তন করেছি। এর ফলে এখন গভর্নিং বডিতে মাস্টার্স পাস ছাড়া কেউ সভাপতি বা বিদ্যোৎসাহী হতে পারবেন না। আমরা একাডেমিক সিলেবাস রিভিউ করে প্রায় ৭০ শতাংশ সিলেবাস সংস্কার করেছি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দক্ষতা বাড়াতে সব বিভাগের জন্য আইসিটি ও ইংরেজি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাদের প্রেজেন্টেশন স্কিল ডেভেলপ করছি। এর পরে আমরা শিক্ষার্থীদের কিছুটা টেকনিক্যাল এডুকেশনের দিকে নিয়ে যাব। সে অনুযায়ী এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে সালফোর্ড ইউনিভার্সিটির সঙ্গে কিছু কাজ শুরু করেছি। আমাদের সব কাজের একটাই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য-ছাত্রছাত্রীরা যেন ক্লাসে ফিরে আসে, পড়াশোনা করে জ্ঞান অর্জন করে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা যেন চাকরি পায়, উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে। তাদের যেন চাকরির বাজারে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।’

উপাচার্য বলেন, ‘এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হচ্ছে। সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। এটি শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ শিক্ষার্থী প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। দেশের বড় কোম্পানিগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট নিচ্ছে।’

উপাচার্য বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদান পায় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো বরাদ্দ পায় না। আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো, শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে টেকনিক্যাল কোর্স পড়াতে যাচ্ছি। কিন্তু টেকনিক্যাল কোর্সের রিসোর্স পারসনদের অপ্রতুলতা কীভাবে সমাধান করব তা নিয়ে দাতা সংস্থাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। সারা পৃথিবীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট কাজ করছে। তারা দেশের জন্য অনেক রেমিট্যান্স আনছে। তারা যদি আরেকটু স্কিল হতো, তারা যদি আরেকটু দক্ষ হতো তাহলে আমাদের রেমিট্যান্সের সংখ্যা দ্বিগুণ হতো। তাদের স্কিল বৃদ্ধি করাটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের।’

উপাচার্য বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসনের কিছুটা অভাব রয়েছে। সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। যেখানে জবাবদিহিতার অভাব আছে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা বিএনপির ইশতেহারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিবসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্টরাও এ বিষয়ে অবগত আছেন যে এ মুহূর্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাটা কোথায় আর মান উন্নয়নের জন্য কী কী করা দরকার। এসব ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights