জামায়াতের আদর্শ ও সাম্প্রতিক বিতর্ক
এম এ আজিজ
‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ নামটি ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের সময় পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হয়। দলটির দীর্ঘদিনের বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক স্লোগান-‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’-এর মধ্যেই তাদের ঘোষিত আদর্শিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন রয়েছে। এখন আর দলটির নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে সেই স্লোগানের আওয়াজ শোনা যায় না। কিন্তু নির্বাচনি রাজনীতিতে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, ক্ষমতার সমীকরণে তাদের বাড়তে থাকা গুরুত্ব এবং সংসদে একটি বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভাবের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। দলটির ঘোষিত নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি বাস্তব রাজনৈতিক আচরণে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়ী হয় এবং দলটির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট মোট ৭৭টি আসন লাভ করে।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও এই ফলাফল জামায়াতকে সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তির অবস্থানে নিয়ে আসে এবং দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণে দলটির গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে এখন শুধু নির্বাচনি সাফল্য নয়, বরং জনসমক্ষে ঘোষিত আদর্শ, নৈতিক অবস্থান ও শৃঙ্খলার সঙ্গে দলটির নেতা-কর্মীদের বাস্তব রাজনৈতিক আচরণের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে-সেই প্রশ্ন ক্রমেই বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
এই নির্বাচনি সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, জামায়াতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্বশীল, সংযত, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়নিষ্ঠ সংসদীয় ভূমিকার মাধ্যমে দলটিকে ঘিরে থাকা পুরোনো সংশয় ও নেতিবাচক ধারণা অনেকটাই দূর করবেন। তাঁদের বক্তব্য, আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ইতিবাচক হবে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে-এমন প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু কয়েকজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক সেই প্রত্যাশাকে পানসে করে দিয়েছে।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসংশ্লিষ্ট হলেও এর প্রভাব দলীয় ভাবমূর্তিতে পড়া স্বাভাবিক। কারণ জামায়াতে ইসলামী নিজেকে নৈতিকতা, সততা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিভিত্তিক আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করে। দলটির গঠনতন্ত্রেও ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ রয়েছে। ফলে তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য ও আচরণ শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা হয় না; বরং সেগুলো দলটির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গেও তুলনা করা হয়।
কোনো জনপ্রতিনিধির বক্তব্যে তথ্যগত অসংগতি, অসতর্ক মন্তব্য কিংবা বিতর্কিত আচরণ দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বা ভাবমূর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সংশ্লিষ্ট দলের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে একজন নেতার বক্তব্য বা আচরণ জনমনে দলটির সামগ্রিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। তেমনি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা জামায়াতের ভাবমূর্তি বিতর্কিত করেছে।
যেমন কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের শিশু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করা, ভিডিওতে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে এক কিশোরীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা, নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আবদুল মুনতাকিমের পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমানের ফ্ল্যাটের দরজা-জানালায় পর্দা এবং ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেনের দাবি করা, কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজা বাজেটের হিসাবে গরমিল দেখা। ডা. তাহের গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করেন। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার সীমান্ত পাড়ি দেওয়া মানুষদের আশ্রয় দেয় এবং পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রসাত্মকভাবে তাঁর দাবিকে স্বাগত জানান। তাহেরের বক্তব্যের পর সংসদে আলোচনা ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে আরও গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়। এক কিশোরীর সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। জামায়াতে ইসলামী জরুরি বৈঠকে বসে। তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দলটি বিষয়টিকে সাংগঠনিক ও নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছে।
জামায়াতের আদর্শ ও সাম্প্রতিক বিতর্কআবদুল মুনতাকিমের বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়। ১৪ জুন বাজেট অধিবেশনে তিনি তাঁর পরিবারের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা তুলে ধরে দাবি করেন, তাঁর বাবা ও দাদা যুদ্ধে শহীদ হন এবং তাঁদের পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পরে তাঁর বাবা জীবিত থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মুনতাকিম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সংসদে তিনি কীভাবে ওই বক্তব্য দিয়েছেন, তা বুঝতে পারছেন না। অর্থাৎ সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ‘মিথ্যা প্রমাণিত’ হয়েছে।
মু. মিজানুর রহমানের একটি বক্তব্যও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৭ জুন সংসদে তিনি সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা ফ্ল্যাটে জানালা-দরজায় পর্দা লাগানো এবং ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন সরবরাহের দাবি জানান। বক্তব্যটি সরাসরি কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়; তবে একজন কথিত আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যের কাছ থেকে সরকারি আবাসনের সুযোগসুবিধা নিয়ে এ ধরনের দাবি জনপরিসরে কীভাবে প্রতিভাত হয়, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
মুফতি আমির হামজার বক্তব্য নিয়েও একাধিকবার আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় তিনি বাজেটের আকার কমিয়ে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা করার পক্ষে মত দেন। একই বক্তব্যে নিম্নমানের সিগারেটের নির্ধারিত ও খুচরা মূল্যের ব্যবধান তুলে ধরে প্রতি শলাকায় ৮০ পয়সা অতিরিক্ত আদায়ের কথা বলেন এবং হিসাব দেন, এতে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে। তাঁর এসব হিসাবের নির্ভুলতা ও যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের মান নিয়েও আলোচনা সৃষ্টি করে।
আমির হামজা এর আগেও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন। ২৭ মার্চ কুষ্টিয়ায় জুমার নামাজের আগে এক বক্তব্যে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হওয়ার কথাও সংবাদমাধ্যমে আসে। এ ধরনের অভিযোগ বা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মন্তব্য একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংযম, তথ্যের যথার্থতা এবং দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন সামনে আনে।
এসব ঘটনা জামায়াতে ইসলামীর সামগ্রিক চরিত্রের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নয়; বরং এগুলোকে বৃহত্তর একটি প্রশ্নের আলোকে দেখা প্রয়োজন-দলটির ঘোষিত নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আদর্শের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাস্তব আচরণের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু নির্বাচনি সাফল্যে নির্ধারিত হয় না; ক্ষমতা ও সংসদীয় দায়িত্ব পালনের সময় তার প্রতিনিধিরা কতটা সংযত, তথ্যনিষ্ঠ, জবাবদিহিমূলক ও নৈতিক আচরণ করেন, তার ওপরও তা নির্ভর করে। এখানেই ‘কথা ও কাজের সামঞ্জস্য’ গুরুত্বপূর্ণ।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা যখন আধুনিক শিক্ষা, পশ্চিমা সংস্কৃতি কিংবা আধুনিক জীবনধারার বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেন, তখন তাঁদের নিজেদের ও পরিবারের শিক্ষা, জীবনযাপন ও পেশাগত পছন্দ নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হয়। তবে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ বা বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়; বরং বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অন্যান্য জ্ঞানক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
মূল প্রশ্নটি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত কি না, তা নয়; বরং কোনো নেতা জনসমক্ষে যে নীতি, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের পক্ষে অবস্থান নেন, তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও পারিবারিক জীবনে তার প্রতিফলন কতটা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দকে অবশ্যই নেতার আদর্শিক অবস্থানের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। তবে নেতা নিজেই কোনো জীবনধারা, শিক্ষা বা সাংস্কৃতিক প্রভাবের সমালোচনা করলে, পরিবারে তার উপস্থিতি থাকলে কথা ও কাজের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এখানে ‘ইসলামি ইনসাফ’-এর ধারণাটিও প্রাসঙ্গিক। নেতৃত্বের পরিবার যদি আধুনিক শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগকে প্রয়োজনীয় ও বৈধ মনে করে, তবে সাধারণ কর্মী-সমর্থকের সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ ও মর্যাদার পক্ষে থাকা নীতিগতভাবে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ ইনসাফের প্রকৃত পরীক্ষা বক্তৃতায় নয়; বরং নীতি, সুযোগ ও আচরণে সমতা নিশ্চিত করার মধ্যেই। তাই বিতর্কটি আধুনিক শিক্ষা বা বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে নয়; মূল প্রশ্ন ঘোষিত আদর্শ, বক্তব্য ও বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্য। জামায়াতে ইসলামী যদি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার, সততা ও জবাবদিহি তার রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায়, তাহলে এসব মূল্যবোধ দলটির সংসদ সদস্যদের বক্তব্য, আচরণ, সংসদীয় দায়িত্ব পালন ও জনসমক্ষে জবাবদিহির মধ্যেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে হবে। কারণ একটি দলের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু নির্বাচনি সাফল্য বা আসনসংখ্যায় হয় না; বরং ক্ষমতা ও দায়িত্বের অবস্থানে থেকেও তারা ঘোষিত আদর্শ কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করে, তার ওপরই বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে।
♦ লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
