জামালদের প্রীতি মারিয়াদের ফাইনাল
মনোয়ার হক
ফুটবলে পুরুষ ও নারী দলের মানের পার্থক্যটা বিচার করাটা আসলেও যৌক্তিক নয়। পুরুষদের নৈপুণ্যের কারণেই তো বিশ্বে ফুটবলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। পুরুষ জাতীয় দলের বিশ্বকাপে দুনিয়া কাঁপালেও মেয়েদেরটা কখন শুরু বা শেষ হয় অনেকেই খবর রাখেন না। এই হলো ফুটবলে পুরুষ ও নারী দলের মূল পার্থক্যটা। বাংলাদেশে নারী ফুটবলেও কোনো খোঁজখবর ছিল না। হবেই বা কীভাবে? খেলা তো দূরের কথা, মেয়েরা তো ঠিকমতো বলে লাথি মারতেই জানত না। ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুধু পুরুষদের নিয়েই উত্তেজনায় কাঁপত বাংলাদেশ। তারকা বলতে শুধু পুরুষদের বোঝাত। কত যে নাম তা হিসাব মেলানো মুশকিল।
সেই বাস্তবতা এখন কি আছে? গত ১০ বছরের চিত্রে হিসাব অনেকটা উল্টো পথে কি হাঁটছে না। জাতীয় দলের সাফল্যের দিকে তাকালে কী দেখছি। পুরুষরা তো কোনো টুর্নামেন্টে ফাইনালই উঠতে পারেনি। আর মেয়েরা তো জাতীয় কিংবা বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে ট্রফির পর ট্রফি জিতেছে। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। বাংলাদেশ পুরুষ জাতীয় দল আজ সান মেরিনোর বিপক্ষে লড়বে। ইউরোপের মাটিতে ইউরোপের কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবে। নিঃসন্দেহে এটি আনন্দের। কিন্তু ম্যাচটি কোনো প্রতিযোগিতামূলক লড়াই নয়। তাহলে কেন খেলছে? সত্যি বলতে কি পারফরম্যান্স যাচাই করতে। অন্যদিকে নারী জাতীয় দল গোয়ায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হতে আগামীকাল স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে লড়বে। পার্থক্যটা তাহলে কী দাঁড়াল জামাল ভূঁইয়ারা মান যাচাইয়ে প্রীতি আর মারিয়া মান্ডারা হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হতে লড়বেন।
না কাউকে ছোট করতে নয়, সেদিন শুরু করা ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা যে এগিয়ে গেছেন তা স্পষ্ট করা হলো। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পুরুষ বিশ্বকাপ খেলাটা স্বপ্ন বলেই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে এ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বলা হয়। এমন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পুরুষ দল তো বরাবরই ফেবারিট থাকে। কতবার শিরোপা জিতেছে তারা? ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়ার পর একবারই চ্যাম্পিয়ন। ২০০৩ সালে ঢাকায় ফাইনালে টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে হারিয়ে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল আমিনুল হকদের। এরপর আর ফাইনালই খেলতে পারেনি। গত ১০ বছরে বড় প্রাপ্তি বলতে একবার সেমিফাইনাল খেলা। নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে জাতীয় দল গড়াটাই এক সময়ে কঠিন ছিল। সাফ বলতে তখন শুধু ভারতকেই বোঝাত। তারপরও ২০১৬ সালে বাংলার মেয়েরা প্রথমবার ফাইনাল খেলেছিল। হেরে যায় ভারতের কাছে। সেই মেয়েরা ১০ বছরের মধ্যে চারবার ফাইনাল খেলবে এবং তা টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হতে। পুরুষ দল ২৩ বছর আগে একবার সাফ জিতেছে। আর মেয়েরা ছয় বছরে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নের অপেক্ষায়। বলা যেতেই পারে, পুরুষ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ভারতের হলেও মেয়েদেরটি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। পুরুষ ফুটবলে সুযোগসুবিধার ঘাটতি নেই। প্রবাসী ফুটবলার, বড় অঙ্কের ডলার খরচ করে বিদেশি কোচ এবং ঘরোয়া লিগে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক। মেয়েরা বেতন পেলেও তা খুবই তুচ্ছ। যেনতেনভাবে ক্যাম্প করা হয়। অল্পতেই মেয়েরা ফুটবলে উচ্চতায় চলে গেছে। মেয়েরা যখন এশিয়ান কাপ চূড়ান্ত পর্বে খেলে। তখন পুরুষ জাতীয় দলে হামজা, সামিত, জায়ানদের মতো উঁচঁমানের প্রবাসীদের খেলিয়েও বিদায় নেয় বাছাই পর্ব থেকে, তা কি লজ্জা নয়? এখন কিন্তু পুরুষদের চেয়ে নারী ফুটবলারদের নাম উচ্চারিত হয় বেশি। সাবিনা, ঋতুপর্ণা, মারিয়া মান্ডা, তপুরা, সাগরিকাদের নাম মুখে মুখে। গ্যালারি থেকে চেনা যায় তাদের। আর পুরুষ বেলায় জার্সি নম্বর দেখে। ফুটসাল তো ফুটবলেরই অংশ। সেই টুর্নামেন্টে পুরুষ ও নারী দল একই সঙ্গে খেলেছে। মেয়েরা হয়েছে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। অন্যদিকে পুরুষদের অবস্থান পাঁচে।
মেয়েরা শিরোপার পর শিরোপা জিতলেও এখনো তারা অবহেলায় বন্দি। দেশে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা তো দূরের কথা লিগই ঠিকমতো হয় না। যখন হয় তখন কি তাকে লিগ বলা যায়? পুরুষরা অবশ্যই প্রাধান্য পাবে। তাই বলে কি মেয়েদের শুধু প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হবে? হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন আর প্রীতি ম্যাচের আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকার পরও ফুটবলের হর্তাকর্তারা কি তা বোঝেন না?
