জ্বালানি সংকটে ডিজিটাল প্রতারণা

অনলাইন ডেস্ক

দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহও চলছে গত বছরের মতোই স্বাভাবিক গতিতে। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো; দেশজুড়ে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, কোথাও বিক্রিতে অনিয়মিত বিরতি, কোথাও আবার হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে তেল বিক্রি। চরম এ সংকটকে কাজে লাগিয়ে কালোবাজারি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা রাতের আঁধারে ড্রাম ও কন্টেইনারে করে হাজার হাজার লিটার তেল কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। বেশ কিছুদিন ধরে এমন অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও জ্বালানি নিয়ে ডিজিটাল প্রতারণা ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে।

জ্বালানির ব্যাপক চাহিদা ও সরবরাহে অস্থিরতাকে ঘিরেই অনলাইনে সক্রিয় হয়েছে বহু প্রতারক চক্র। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেজ খুলে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে চক্রগুলো।

মোটরসাইকেল চালকরাও মরিয়া হয়ে এসব ফাঁদে পা দিচ্ছেন। চক্রগুলো তাদের কাছ থেকে অগ্রিম বুকিংয়ের নামে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ঘটনা-১

ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল না পেয়ে এ ব্যাপারে খোঁজ করতে ফেসবুক ঘাঁটছিলেন সাদমান (ছদ্মনাম)। নিজের আইডি থেকে তেলের আপডেট নেওয়ার জন্য স্ক্রল করতে করতে পেয়ে যান ‘বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন’ নামে একটি পেজ। তিনি পেজটিতে ঢুকলে অকটেন-পেট্রোল-ডিজেল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পান।

বিজ্ঞাপনে লেখা- ‘প্রিয় ভাই ও বোনেরা আসসালামু আলাইকুম, সারা বাংলাদেশে একমাত্র আমরাই দিচ্ছি অকটেন-পেট্রোল-ডিজেল; এই ক্রান্তিলগ্নে সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি করা হবে। ডিজেল ৯০ টাকা, পেট্রোল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা। সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি করা হবে। ডেলিভারি চার্জ প্রযোজ্য।

বিস্তারিত জানতে একটি এয়ারটেল নম্বর দেওয়া হয়েছে। সাদমান ওই নম্বরে যোগাযোগ করে কথা বলেন। ২০ লিটার অকটেনের জন্য অগ্রিম ২০০ টাকাও দেন। কিন্তু এরপর বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন পেজে দেওয়ার নম্বরটি থেকে তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়।

বিষয়টি জানার পর প্রতিবেদক ওই নম্বরে কল করেন। পরিচয় গোপন রেখে তিনি ১৫ লিটার অকটেন কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাকে জানানো হয়, তেল পেতে হলে আগে ২০০ টাকা অগ্রিম পাঠাতে হবে। টাকা পাওয়ার একদিন পর তেল সরবরাহ করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে বিক্রেতার অবস্থান জানতে চাইলে জানানো হয়, তিনি মোংলা বন্দর বাজার এলাকায় আছেন। তখন জুবাইর দিগরাজ বাজারে তেল ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে হঠাৎ উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া আসে। চিৎকার করে বলা হয়, ‘আপনি আমার ব্যবসা নষ্ট করবেন, আমার দোকানে রেইড দিতে চান?’ এরপরই কলটি কেটে দেওয়া হয়।

একইভাবে বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন পেজটিতে গ্রাহক সেজে অন্য একটি নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করা হলে একই ধরনের প্রতারণার চিত্র সামনে আসে। সেখানে ২০ লিটার অকটেন কিনতে চাইলে জানানো হয়, অগ্রিম ২০০ টাকা দিতে হবে। এরপর ডেলিভারি ম্যানের কাছে বাকি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

লোকেশন জানতে চাইলে আবারও বলা হয়, মোংলা বন্দরের বাজার এলাকা। তবে সেখানে সরাসরি লোক পাঠানোর প্রস্তাব দিলে জানানো হয়, এই সেবা শুধু অনলাইনের মাধ্যমেই নেওয়া যাবে। বিক্রেতার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম ‘রায়হান’ এবং বাসা খুলনায় বলে দাবি করেন।

ঘটনা-২

খুলনা অঞ্চল থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে এমন প্রতারণা অভিযোগ পাওয়া গেলে বাংলানিউজের ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট এস. এস শোহান সেটি সরেজমিনে অনুসন্ধানে যান। তিনি বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশনের খোঁজে মোংলা বন্দর বাজার এলাকায় গিয়ে পেজটিতে দেওয়া নম্বরে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেন। কিন্তু নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তিনি এ নামে কোনো দোকান আছে কি না, রায়হান নামে কেউ খোলাবাজারে ও অনলাইনে তেল বিক্রি করেন কি না খোঁজ নেন। আশপাশের বিভিন্ন দোকানি, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে শোহান এমন পেজ বা ওই নম্বরের স্বত্বাধিকারীর অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।

এরপর তিনি তেলের বিষয়ে খোঁজ নিতে শনিবার (১৮ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে বাগেরহাট শহরের খারদ্বার এলাকায় খানজাহান আলী ফিলিং স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষমাণ কয়েকজন মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তার সঙ্গে কথা হয় একটি ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল প্রমোশন কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান রোকনের সঙ্গে। তেল না থাকায় তিনি প্রায় ৬ কিলোমিটার মোটরসাইকেল ঠেলে পাম্পে এসেছেন। জ্বালানি সংকটে ভোগান্তির কথা জানতে চাইলে রোকন অনলাইনে তেল কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

রোকন বলেন, গত বৃহস্পতিবার কচুয়া উপজেলার মঘিয়া এলাকায় তার মোটরসাইকেলের তেল শেষ হয়ে যায়। রাস্তার পাশে বসে মোবাইল ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করার সময় বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশন নামে পেজটি চোখে পড়ে তার। সেখানে তেল পাওয়া যাচ্ছে, এমন পোস্ট দেখে তিনি পেজটিতে দেওয়া নম্বরে কল করেন। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে তাকে জানানো হয়, তেল দেওয়া সম্ভব তবে একদিন পর। অনেক অনুরোধের পর তিন ঘণ্টার মধ্যে তেল পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ২৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জ চাওয়া হয়।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল ঠেলে নেওয়ার চেয়ে ২৫০ টাকা দেওয়া ভালো মনে করে টাকা পাঠাই। কিন্তু দুই ঘণ্টার মধ্যেই আমাকে ব্লক করে দেয়। এরপর আর ফোন ধরেনি। অন্য নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করলে বিষয়টি বুঝতে পেরে কল কেটে দেয়।

রোকন আরও জানান, তার সহকর্মী আরও দুজন একই কৌশলে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তেল সংকট শুরুর পর কয়েকদিন বাধ্য হয়ে তারা খোলা বাজার থেকে বেশি দামে তেল কিনেছেন।

ঘটনা-৩

এ ঘটনাটি ঢাকার। ফেসবুকে ফুয়েলএক্স (FuelX) নামে একটি পেজ থেকে জ্বালানি তেল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে সেটিতে যোগাযোগ করেন বেসরকারি চাকরিজীবী নাফি। পেজের বিবরণীতে লেখা- ‘FuelX: সরাসরি নিজস্ব পয়েন্ট থেকে ১০০% খাঁটি হাই-গ্রেড ফুয়েল ও ইঞ্জিন অয়েল সরবরাহ করি। বাইকের ইঞ্জিনের সেরা সুরক্ষা ও স্মুথ রাইডিং নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। বুকিং চার্জ: ঢাকা ১৫%, বাইরে ২০%। অরিজিনাল পণ্যের নিশ্চয়তায় অর্ডারের জন্য ইনবক্স করুন।’

পেজের ঠিকানায় লেখা: আব্দুল্লাহপুর মেইন রোড (পার্সেল স্ট্যান্ড সংলগ্ন), উত্তরা, ঢাকা- ১২৩০। মেসেজ দেওয়ার পর পেজটি থেকে পাল্টা উত্তরে লেখা হয়- ‘আসসালামু আলাইকুম, FuelX Bangladesh-এ আপনাকে স্বাগতম! আমাদের কাছে পাচ্ছেন ১০০% খাঁটি ও ভেজালমুক্ত প্রিমিয়াম কোয়ালিটি পেট্রোল, অকটেন এবং লুব্রিকেন্ট। আমরা সরাসরি ডিপো থেকে সংগ্রহ করে ড্রাম বা বোতলে রিফিল করে কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দিই।

কেন আমাদের থেকে তেল নেবেন? সরাসরি ডিপো (সাভার/নারায়ণগঞ্জ হাব) থেকে সংগৃহীত। পরিমাপে কোনো কমতি নেই, ১০০% সঠিক ওজন। তেলের ঘনত্ব ও কালার চেক করে নেওয়ার সুযোগ। জেনারেটর, বাইক বা কার— সবকিছুর জন্য নিরাপদ। আজকের রেট লিস্ট: হাই-গ্রেড অকটেন: ১২০/- টাকা (প্রতি লিটার) সুপার ফ্রেশ পেট্রোল: ১২০/- টাকা (প্রতি লিটার) ইঞ্জিন অয়েল (মবিল): ৪৫০/- টাকা থেকে শুরু গিয়ার অয়েল: ২২০/- টাকা

অর্ডার করার নিয়ম: আপনার নাম, মোবাইল নাম্বার এবং পূর্ণ ঠিকানা লিখে মেসেজ করুন। নিরাপত্তার খাতিরে এবং ডেলিভারি কনফার্ম করতে: ঢাকার ভেতরে ১৫% বুকিং চার্জ প্রযোজ্য। ঢাকার বাইরে ২০% বুকিং চার্জ প্রযোজ্য। (বাকি টাকা তেল হাতে পাওয়ার পর পেমেন্ট করবেন।)

বি: দ্র: আমাদের তেল সরাসরি ব্যবহার করে দেখুন, মানের সামান্যতম এদিক-সেদিক হলে ১০০% মানি ব্যাক গ্যারান্টি! অর্ডার কনফার্ম করতে চাইলে এখনই আপনার লোকেশন জানান। ধন্যবাদ।’

এই পেজটিতে একটি রবি নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটিতে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে কল কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কল করা হলে অপরপ্রান্ত থেকে সেটি রিসিভ করা হলেও কেউ কথা বলেনি।

ফেসবুকে এ ধরনের পেজ আছে আরও। অনুসন্ধানে ‘সততা পাইকারি স্টোর’, ‘অকটেন পেট্রোল গ্রুপ ঢাকা’, ‘অকটেন পেট্রোল হাউজ’, ‘অকটেন পেট্রোল বাজার’, ‘পেট্রোল অকটেন ডিপো’ এবং ‘বিশিষ্ট পেট্রোল-অকটেন-ডিজেল ব্যবসায়ী’ নামে আরও কয়েকটি পেজের নাম পাওয়া গেছে। এসব পেজ থেকে সাধারণত বাজারমূল্যে সহজভাবে সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে অকটেন, পেট্রোল বা ডিজেল বিক্রির প্রলোভন দেখানো হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় পোস্ট, ভুয়া রিভিউ এবং ডেলিভারির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। আগ্রহী ক্রেতাদের ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলা হয়, যেখানে ব্যক্তিগতভাবে দর-কষাকষির পর দ্রুত লেনদেনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে প্রতারকরা।

প্রতারণার মূল ধাপটি ঘটে অর্থ লেনদেনের সময়। ক্রেতাদের কাছ থেকে বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। টাকা পাঠানোর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া চালান বা ডেলিভারির স্ক্রিনশট পাঠিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পণ্য আর ভোক্তার হাতে পৌঁছায় না।

এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে একই চক্র একাধিক পেজ ব্যবহার করে নিজেদের ‘বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী’ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং পারস্পরিক রেফারেন্স দেখিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন।

খোলাবাজারে তেল বিক্রির বিষয়ে ব্যবস্থা:

অনলাইনে পাশাপাশি খোলাবাজারেও জ্বালানি তেল নিয়ে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, পাম্পের চেয়েও অতিরিক্ত দামে সুযোগসন্ধানীরা তেল বিক্রি করছে। তেলের দাম দেওয়া হচ্ছে ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোল পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা সরকারি নির্দেশনা মেনেই তেল সরবরাহ করছে এবং এ বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

খানজাহান আলী পেট্রোল স্টেশনের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মুরশিদ কুলি খান জানান, ডিপো থেকে প্রাপ্ত তেল মজুদ ও বিক্রির প্রতিটি ধাপই নির্ধারিত ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী মোটরসাইকেলসহ সকল যানবাহনেই তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে কেউ যদি মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত তেল নিয়ে তা মজুদ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করে, সে ক্ষেত্রে পাম্প কর্তৃপক্ষের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সন্দেহজনকভাবে কেউ বারবার তেল নিতে এলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণ তেল দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।

ওই পাম্পের ট্যাগ অফিসার মো. ফারুক আহমেদ বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন ডিপো থেকে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, তা যানবাহনের চাহিদা অনুযায়ী বণ্টন করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট বা কোনো সিন্ডিকেট যাতে গড়ে না ওঠে, সে জন্য তারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

নজরদারি চলছে বলে দাবি প্রশাসনের:

তেল সংকটকে কেন্দ্র করে মজুদ ও কালোবাজারি ঠেকাতে বাগেরহাটে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সংকট শুরুর পর থেকেই জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কোস্টগার্ড যৌথভাবে অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

এর অংশ হিসেবে গত ২৮ মার্চ মোংলায় যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের অয়েল ইনস্টলেশনে অভিযান চালিয়ে নির্ধারিত হিসাবের বাইরে ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল বেশি পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (অপারেশনস) মো. আল আমিন খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং স্থাপনার তিনটি ট্যাংকি সিলগালা করা হয়। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকজন ক্ষুদ্র মজুদদারকে জরিমানাও করা হয়েছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী বলেন, তেল মজুদ ঠেকাতে পুলিশ নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে প্রতারণা বা অবৈধভাবে তেল মজুদের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। তেল সংকট নিরসন এবং যানবাহন চালকদের কাছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে অনলাইনে তেল কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রতারণার ঝুঁকি থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, জেলার প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাতে সরবরাহ ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম না ঘটে এবং ভোক্তারা স্বচ্ছ সেবা পান।

অন্যদিকে, অনলাইনে তেল ক্রয়-বিক্রয়ের ঝুঁকি প্রসঙ্গে ফ্রিল্যান্সার জয়দেব ঘোষ বলেন, বর্তমানে মানুষ ক্রমেই অনলাইননির্ভর হয়ে উঠছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্য খোঁজার ক্ষেত্রে প্রথমেই ডিজিটাল মাধ্যমের আশ্রয় নিচ্ছে। এই সুযোগে প্রতারক চক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হলে। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া অনলাইনে লেনদেন না করাই উত্তম।

জয়দেব আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকলে অনলাইন প্রতারণা করে পার পাওয়া কঠিন। প্রতারকরা সাধারণত বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করে থাকে। এসব মাধ্যমের লেনদেন ও সিম-সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

সতর্ক থাকার পরামর্শ পুলিশের:

জ্বালানি তেলকে কেন্দ্র করে অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে কথা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে কয়েকটি পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেল বিক্রির নামে যেসব পোস্ট বা পেজ দেখা যায়, সেগুলোর বেশিরভাগই ভুয়া। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা পেজে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিশেষ করে অগ্রিম টাকা চাওয়া হলে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

এন এম নাসিরুদ্দিন পরামর্শ দেন, কোনো অপরিচিত নম্বর বা অনলাইন পেজে অর্থ লেনদেন না করে নিকটস্থ অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন থেকেই জ্বালানি সংগ্রহ করা নিরাপদ। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সত্যতা যাচাই করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করতে হবে অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর যোগাযোগ করতে হবে। পুলিশ মাঠে কাজ করছে, তাদের সহায়তা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রতারণায় ব্যবহৃত নম্বর, বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট বা সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।

যেহেতু অনলাইনে প্রতারণাটি হচ্ছে, আইসিটি বা সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত কোনো সুবিধা ভুক্তভোগী পাবে কি না, প্রশ্নের উত্তরে ডিএমপির এ কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের যে আইন আছে, সেটি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র: বাংলানিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights