জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করা উচিত

জিন্নাতুন নূর

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এই পরিস্থিতি আরও কয়েক সপ্তাহ চললে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এ অবস্থায় সরকারকে বিশাল ভর্তুকির বোঝা নিতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলছেন, ভর্তুকির এই বোঝা না বাড়িয়ে বিকল্প উপায়ে যেতে হবে। ভর্তুকি বন্ধ করে বাইরের দেশের মতো বিত্তবান যারা, বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তাদের বিদ্যুতের মূল্য সø্যাব অনুযায়ী বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া জ্বালানি ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। এক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কষ্ট হলেও ব্যবহারকারীদের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করার মানসিকতা রাখতে হবে। আর বিশ্ব¦বাজারে এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি পেলে দুই কার্গোর বদলে এক কার্গো এলএনজি দিয়ে চাহিদা মেটাতে হবে। এমনটি করলে সরকারকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না বলে তারা মনে করেন।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন ভর্তুকি কমাতে হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে হবে। এখন যে জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে সেগুলো যুদ্ধে দাম বৃদ্ধির আগের চুক্তির দামেই আসছে। নতুন যে জ্বালানি কিনবে সরকার যেমন স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি না করা গেলে সরকারের ভর্তুকি বেড়েই যাবে। এখানে অতিরিক্ত মূল্য হয় সরকার দেবে না হলে ব্যবহারকারীকে দিতে হবে। না হলে মাঝখানে যে কোম্পানিগুলো আছে তাদের দিতে হবে। এমনিতেই সরকারের আগের বকেয়া আছে। এর সঙ্গে নতুন খরচ যোগ হচ্ছে। সে তুলনায় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তেমন নেই। ভর্তুকি যেটা বাড়বে তা হয় ধার করে অর্থায়ন করতে হবে, না হলে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ থেমে গেলে বাজার স্বাভাবিক হলে জ্বালানির খরচ কমে যাবে। কিন্তু এই বিষয়টি অনিশ্চিত। আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিদ্যুতে যে ভর্তুকি দেওয়া হয় তার সিংহভাগই যায় বিত্তবানদের কাছে। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, মাইক্রোওয়েভ- এ ধরনের যন্ত্র বেশি ব্যবহার করেন। বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন বিত্তবানরা বেশি। সেখানে দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত মূল্য দেওয়ার সক্ষমতাও আছে। বিদেশে বিভিন্ন সø্যাব অনুযায়ী দাম বৃদ্ধির যে মাত্রা তা বিত্তবানদের ক্ষেত্রে বেশি বৃদ্ধি করতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প দেখি না। বাসাবাড়ির গ্যাসের ক্ষেত্রেও উচ্চ মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এমন চিন্তা করা যায়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাধারণ অবস্থাতেই ভর্তুকি নিয়ে আমাদের সমস্যা ছিল। আর এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ- এরই মধ্যে শুরু হবে। কিন্তু বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন এ বিষয়ে যা করবেন তা ঈদের পরে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এটা হবে মহাবিপদ। এক্ষেত্রে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। আমরা শুনেছি কিছু ট্যাংকার এসে গিয়েছে। এগুলো দিয়ে ঈদের বন্ধের আগ পর্যন্ত চাহিদা সামলানো গেলে দুই সপ্তাহ আমাদের জ্বালানি চাহিদা কম থাকবে। মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুতে আমাদের ওপর জ্বালানি সংকটের ধাক্কা পড়বে। তখন সরকারকে রেশনিং করে জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। সারা বছর ধরে ব্যবহারকারীদেরও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা রাখতে হবে। এখন বুঝতে পারছি সারা বছরই ভালো ধরনের লোডশেডিং হবে। তবে শিল্প খাত সামলাতে হলে তাদের ভালো পরিমাণের গ্যাস দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এলপিজির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আমরা ভেবেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার এই ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করবে কিন্তু করেনি। আশা করছি নতুন সরকার আমাদের কথা শুনবে। তিনি আরও বলেন, দাম বৃদ্ধি পেলে দুই কার্গোর জায়গায় এক কার্গো এলএনজি কিনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। জানা যায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েত মিলে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি স্থগিত করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বাজারে দর অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম ৯ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৩ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকিতে রেকর্ড হতে পারে বলে খাত-সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বিশেষ করে কাতারের এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘস্থায়ীভাবে বন্ধ হলে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। খাত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল এই ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে তা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা করছে খোদ বিদ্যুৎ বিভাগ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশকে প্রায় দ্বিগুণ দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজার থেকে বাড়তি দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগও নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে বেড়ে গেছে কয়লার দামও। এতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাবে। সরকারের এই মুহূর্তে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা না থাকায় বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ভর্তুকির চাপ অনেক বেড়ে যাবে। এমনিতেই ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারের অবস্থা কাহিল। এই অবস্থায় নতুন করে ভর্তুকির চাপ নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights