টিআইবির কার্টুন প্রদর্শনী, রংতুলিতে দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি

অনলাইন ডেস্ক

নানা রঙের ছবি আর কার্টুন। কোনোটিতে ফুটে উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিপীড়নের চিত্র। রয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিপ্লব, ‘নতুন বাংলাদেশের’ যাত্রা ও আগামী দিনের সম্ভাবনার ছবি। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে মাইডাস সেন্টারের উদয়পদ্ম মিলনায়তনের দেয়ালে সাজানো হয়েছে এসব কার্টুন আর ছবি, যেখানে ফুটে উঠেছে দেশের বিভিন্ন খাতে সংঘটিত দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি।

কার্টুনে তুলে ধরা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী সরকারের অত্যাচার, অনাচার, মিথ্যাচার ও স্বেচ্ছাচারের চিত্র। কার্টুনগুলো এঁকেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা। সোমবার টিআইবির ১৯তম কার্টুন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার বিতরণের পাশাপাশি ১৩ দিনব্যাপী প্রদর্শনী ও ভার্চুয়াল গ্যালারিও উদ্বোধন করা হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ডের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স কোরিন হেনচজ পিগনানি, বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডসের ডেপুটি হেড অব মিশন থিইজ উডসট্রা, এফসিডিওর ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর ডানকান ওভারফিল্ড, ইউএসএআইডির ডেমোক্রেসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স অফিসের পরিচালক অ্যালেনি টেনসে, বাংলাদেশে সুইডেন দূতাবাসের পলিটিক্যাল, ট্রেড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান লুভিসা হফম্যান প্রমুখ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কার্টুন প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব, ‘নতুন বাংলাদেশের’ যাত্রা ও সম্ভাবনা। অনেক কার্টুনে দেশের সার্বিক অর্থনীতির দুর্দশা ফুটে উঠেছে।

সেবা খাতে দুর্নীতির কারণে জনদুর্ভোগের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে কিছু কার্টুনে। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলীয়করণ, আমলাতন্ত্র, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অনিয়ম, অনাচারের কারণে দুদক দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সাঁড়াশি বা শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে দুুদককে ঢেলে সাজাতে হবে। দুদক সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন সংস্কার কাজও চলছে। এবার বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে।

অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন সম্ভাবনার বাংলাদেশ। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দুদকের পাশাপাশি রাষ্ট্রকাঠামো এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান অব্যাহত রাখবে। ‘উম্মাদ’ পত্রিকার সম্পাদক কার্টুনিস্ট আহসান হাবিব বলেন, এবারের ‘দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী’ একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ‘ক’ ও ‘খ’ গ্রুপের রেগুলার কার্টুনের বাইরে কমিকস ও ডিজিটাল কার্টুন যুক্ত হয়েছে। নতুন দুই ক্যাটাগরিতেই আমরা চমত্কার সব কাজ দেখতে পেয়েছি। কমিকসে যেহেতু সংলাপের ব্যাপার আছে এবং একই সঙ্গে একটি গল্প বা মেসেজও দিতে হয়, সেটা তরুণ কমিকস আর্টিস্টরা বেশ ভালোই করেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক কার্টুনিস্ট শাহরিয়ার খান বলেন, এবারের কার্টুন প্রতিযোগিতাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হয়েছে। এটা ১৯তম প্রতিযোগিতা। এই ১৯ বছরের ১৫ বছরই ছিল শেখ হাসিনার সরকার। যেহেতু সেই সরকার ক্রমে কার্টুন-তিরস্কারের ব্যাপারে অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই কার্টুনগুলো খুব ধারালো ছিল না। নতুন প্রেক্ষাপট হওয়ায় এবারের প্রতিযোগিতায় অনেক নতুন আইডিয়ার কার্টুন জমা পড়ে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে ২০০৬ সাল থেকে এই প্রতিযোগিতা চালু করেছে টিআইবি। ‘দুর্নীতি ও অনৈতিকতা’ বিষয়ে আয়োজিত ১৯তম কার্টুন প্রতিযোগিতায় হাতে আঁকা ‘ক’ বিভাগে (১৩-১৮ বছর) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন যথাক্রমে নওগাঁ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শোয়াইব আহমেদ, নওগাঁর বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজর মাহিন মেহজাবিন মোহর এবং রংপুর ক্যাডেট কলেজের আহনাফ তাহমিদ। ‘খ’ বিভাগে (১৯-২৫ বছর) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী অরিন্দম কুণ্ডু, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী আসিফ মোহাম্মদ ইউসুফ এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারাল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জুনায়েদ। উভয় গ্রুপের বিজয়ীদের যথাক্রমে ৭৫ হাজার, ৫০ হাজার ও ৪০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়।

প্রতিযোগিতায় এ বছর প্রথমবারের মতো (১৫ থেকে ২৫ বছর) ডিজিটাল মাধ্যমে আঁকা কার্টুন ও কমিক স্ট্রিপ ক্যাটাগরি যুক্ত করে। ডিজিটাল মাধ্যমে আঁকা কার্টুন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মং সোনাই রাখাইন এবং কমিক স্ট্রিপ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হন ইউল্যাবের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জুনায়েদ। এই দুই বিভাগে বিজয়ীদের পুরস্কার হিসেবে অর্থ, ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়। সব ক্যাটাগরি থেকে মোট ৪২ জন কার্টুনিস্টকে বিশেষ মনোনয়ন পুরস্কার দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights