টিপু হত্যায় ৩৫ নাম, ভিডিও কনফারেন্সে কিলিং মিশন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু কিলিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় রাজধানীর অভিজাত দুটি রেস্টুরেন্টের বৈঠকে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের বিপরীতে একটি রুফটপ রেস্টুরেন্ট এবং ১৫ দিন পর বেইলি রোডের ফখরুদ্দীন বিরিয়ানিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্থানীয় ১০-১২ জন ছাড়াও ভিডিও কনফারেন্সে আরব আমিরাতের দুবাই থেকে যুক্ত হন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ এবং কানাডা থেকে জাফর আহমেদ মানিক। সিদ্ধান্তে জিসান-মানিকের গ্রিন সিগন্যালের পরই কিলিংয়ের সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিখুঁত স্যুটার সুমন শিকদার ওরফে মুছাকে। সব শেষ ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টায় সম্পন্ন হয় কিলিং মিশন। টানা ১৩ মাসের দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রস্তুত হয়েছে চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র)। তদন্তে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডে ৩৫ জনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। শিগগিরই তা আদালতে জমা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র।

জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন ২৪ জন। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেফতার নাসির উদ্দীন মানিক, সুমন শিকদার ওরফে মুসা ও শুটার মাসুম আহমেদ ওরফে আকাশ। সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সোহেল হাওলাদার। চার্জশিট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কারাবন্দি মুসার জবানবন্দিই বেশি প্রভাব ফেলেছে। তবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিগুলো হত্যাকাণ্ডের পর অনেক দেরিতে হওয়ায় এর সমর্থনে অনেক প্রমাণই উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে মুসার জবানিতে ‘এক্সেল সোহেল’ নামে একজনের নাম এলেও তার পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে এরই মধ্যে ১৮ এপ্রিল জামিন পেয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. মারুফ খান, মাহবুবুর রহমান টিটু ও মারুফ রেজা সাগর। এর আগে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন ইশতিয়াক আহম্মেদ জিতু, ইয়াসির আরাফাত সৈকত ও রাকিবুর রহমান। এ ছাড়া মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে ডিসেম্বরে মশিউর রহমান একরাম এবং ২৬ জানুয়ারি জামিন পেয়েছেন আরিফুর রহমান সোহেল ওরফে ‘ঘাতক সোহেল’।

এদিকে সন্তানদের নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন নিহত টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সংরক্ষিত ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর অভিযোগ করে বলেন, ‘এ পর্যন্ত নিরাপত্তার স্বার্থে ছয়-সাতটা জিডি করেছি। কিন্তু এসব কাজে আসেনি। আসামিরা একের পর এক জামিন পেয়ে যাচ্ছে। আমার স্বামীকে মেরে ফেলা হয়েছে। তার সঙ্গে দুর্বৃত্তরা আমাদেরও মেরে ফেললে ভালো হতো। দেশের বাইরে থেকে এবং দেশের মধ্যে থেকে অনলাইনে অজ্ঞাতনামা কল আসে। নানাভাবে তারা আমাদের হুমকি দেয়। পুলিশকে বললে তারা বলে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলে রিসিভ করবেন না।’
জানা গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রস্তুত খসড়া চার্জশিটটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন। এখন তারা পর্যালোচনা করছেন। শিগগিরই তাদের স্বাক্ষর-সংবলিত চার্জশিটটি আদালতে পাঠানো হবে। যদিও চার্জশিট প্রস্তুতের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অনেক আসামি চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে তারা একাধিক প্রভাবশালীকে দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে তদবির করাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্তের কাজ শেষ। চার্জশিটও প্রস্তুত। শিগগিরই আদালতে জমা দেওয়া হবে।

চার্জশিটে যা থাকছে : টিপুকে হত্যার আগে ১৫ ডিসেম্বর কিংবা ১৫ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররমের ঠিক বিপরীতে একটি রুফটপ রেস্টুরেন্টে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ ওরফে মনসুর, মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা সুমন শিকদার ওরফে মুসা, মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল শাহরিয়ার, ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মারুফ রেজা ওরফে সাগর, মোল্লা রানা, আমিনুল ওরফে আমিনুর, বাবুল তালুকদার, রিফাত, টিটু, খাইরুলসহ ১০-১২ জন উপস্থিত ছিলেন। ভিডিও কনফারেন্সে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও মানিক। মূলত ঠিকাদারি ব্যবসা, ডিশ-বাণিজ্য, আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি-বাণিজ্য, এজিবি কলোনি ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনেকের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কারণে সিদ্ধান্ত হয় টিপুকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার। এ জন্য পাঁচজনকে নির্দেশ দেওয়া হয় টাকা সংগ্রহের। কিলিং মিশনে খরচের জন্য কাকে কত দেওয়া হবে তা ঠিক হয় ওই বৈঠকে। এর ১৫ দিন পর রাজধানীর বেইলি রোডের ফখরুদ্দীন বিরিয়ানি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফা বৈঠক। সেখানেও ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন জিসান ও মানিক। মূসার জবানিতে উঠে এসেছে, টিপু হত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে বিচারকের কাছে মুসা বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর সবাই এখন সুবিধা ভোগ করছে আর তিনি ফেঁসে গেছেন। খুনের মাত্র ১২ দিন আগে দেশ ত্যাগ করেন মুসা। সেখান থেকেই সমন্বয় করেন কিলিং মিশনের। পরে ওমান থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে ডিবি পুলিশ।

দুটি বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয়, নিজের এলাকায় নয়, হত্যা করতে হবে পাশের ওয়ার্ড এলাকায়। কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এলাকায় রেকি করতে। মুসার মাধ্যমে মোল্লা শামীমকে অস্ত্র ও বাইক ভাড়ার জন্য দেওয়া হয় ২ লাখ টাকা। মুসাই কিলার খোঁজার দায়িত্ব দেন মোল্লা শামীমকে। পরে শামীম এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন শুটার আকাশের ওপর। কিলিং মিশনে ব্যবহৃত একটা অস্ত্র সরবরাহ করেন মগবাজারের জিতু। আরেকটা শামীমের নিজেরই। শুটার আকাশকে ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেলে করে নিজেই চালিয়ে নিয়ে যান মোল্লা শামীম। হত্যার জন্য সাগরের কাছ থেকে ১৫টি গুলি সংগ্রহ করা হয়। সাগরের ভাই রাকিব এগুলো বিজয় সরণিতে এসে দিয়ে যান।

হতাকাণ্ডের দুই মাস আগে কমলাপুরের রূপালী যুব উন্নয়ন সংঘ ক্লাবে কিলিং মিশনের বিষয়ে সমন্বয় সভা হয়। সেখানে নাসির উদ্দীন মানিক, শুটার আকাশ, আরফান উল্লাহ ওরফে দামাল, মুসা, শামীম, নাসির উদ্দীন মানিক ছাড়াও আরও তিন-চারজন ছিলেন।

মামলার সাক্ষী সোহেল হাওলাদার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেন, ঘটনার ঠিক পরপরই তার বন্ধু বিডি বাবু তাকে ফোন দেন গাড়ির জন্য। বলেন, আকাশের মন খারাপ। কোথাও ঘুরতে যাবেন। পরে তিনি, বিডি বাবু ও আকাশ প্রথমে জয়পুরহাট যান। সব শেষ আকাশকে বগুড়ার একটি হোটেলে রেখে তারা ঢাকায় চলে আসেন।

ডিএমপি (মতিঝিল বিভাগ) ডিবির উপকমিশনার রাজীব আল মাসুদ বলেন, ‘আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সুষ্ঠু তদন্তের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাবে এ রকম কোনো কিছুর সম্মুখীন আমরা এখনো হইনি। তদন্ত শেষ পর্যায়ে। দ্রুতই এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, গত বছর ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টায় রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা জামে মসজিদের কাছে টিপুকে নৃশংসভাবে গুলি করে খুন করা হয়। তিনি নিজের মাইক্রোবাসে বাসায় ফিরছিলেন। গাড়িটি যানজটে পড়ার পর একটি মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা এক যুবক টিপুকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। এ সময় এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন কলেজছাত্রী সামিয়া আফরান প্রীতি। এ ঘটনায় টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights