ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) কোনো ধরনের বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই ভেনেজুয়েলার আকাশপথ ‘বন্ধ’ করে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কয়েক মাস ধরে অব্যাহত সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যে ওয়াশিংটন এবং কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

এর প্রতিক্রিয়ায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় ‘ঔপনিবেশিক’ কায়দায় হুমকি দিচ্ছে। দেশটি বলছে, ট্রাম্পের এই হুমকির ফলে লাখ লাখ নাগরিক নিরাপত্তাহীন অবস্থায় উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ভেনেজুয়েলা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত মহড়া চালিয়ে আসছে এবং বৃহৎ পরিসরে সৈন্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মাদক পাচারকারী নৌকার উপর ধারাবাহিক হামলা শুরুর পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশাল নৌ-সম্পদের মোতায়েন করেছে। ওয়াশিংটন লক্ষ্যবস্তুভুক্ত নৌকাগুলি মাদক পাচারের সাথে জড়িত ছিল এমন কোনও প্রমাণ দেয়নি। এই হামলায় কমপক্ষে ৮৩ জন নিহত হয়েছে।

যদিও নিকোলাস মাদুরো এর আগে সতর্ক করেছিলেন, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে অজুহাত হিসেবে মিথ্যা দাবি তৈরি করছে।

এর আগে গত সপ্তাহে মাদুরোর উপর চাপ বৃদ্ধি করতে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার জনগণের মধ্যে পরিচিত কার্টেল দে লস সোলস বা ইংরেজিতে কার্টেল অফ দ্য সানস নামে পরিচিত সংগঠনটিকে ‘বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তারা ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা ওয়াশিংটনকে মাদুরোকে বেআইনিভাবে ক্ষমতা থেকে অপসারণের ভিত্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাহলে, ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করার পর ট্রাম্প কি ভেনেজুয়েলায় হামলা চালাবেন? মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ কি আইনত ন্যায্য হতে পারে? এবং মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের প্রতিকূল নীতির পেছনে কী কারণ রয়েছে?

জানুয়ারিতে আবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ট্রাম্প মাদুরোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর বক্তব্য দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার এবং ভেনেজুয়েলা থেকে অভিবাসীদের স্রোত আসার জন্য কারাকাসকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প।

এছাড়াও ট্রাম্প তার পূর্বসূরী জো বাইডেনের দেওয়া ভেনেজুয়েলার তেল ছাড় বাতিল করে দেন। এসনকি দেশটি থেকে তেল কিনছেন এমন দেশগুলির উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং মাদুরোকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার দ্বিগুণ করে ৫০ মিলিয়ন ডলার করেন। তাকে ‘বিশ্ব সন্ত্রাসী নেতা’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

সাম্প্রতিক ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, তিনি ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান পরিচালনার জন্য সিআইএকে অনুমোদন দিয়েছেন। কারণ তার প্রশাসন ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী জাহাজ, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, হাজার হাজার সেনা এবং এফ-৩৫ স্টিলথ জেট মোতায়েন করেছে।

গত বৃহস্পতিবার, ট্রাম্প বলেছিলেন যে দেশের অভ্যন্তরে স্থল হামলা হতে পারে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যে, কার্টেল দে লস সোলসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে ট্রাম্প গত সপ্তাহে মাদুরোর সাথে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

গত ২৫ নভেম্বর, এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা ট্রাম্পকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি মাদুরোর সাথে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন কিনা। ট্রাম্প বলেন, আমি তার সাথে কথা বলতে পারি। দেখা যাক। তবে আমরা বিভিন্ন কর্মীদের সাথে এটি নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা কথা বলতে পারি।

ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন তিনি তারই মনোনীত ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের’ একজন নেতার সাথে কথা বলতে চান? তখন তিনি উত্তর দেন, যদি আমরা জীবন বাঁচাতে পারি, আমরা যদি সহজ উপায়ে কাজ করতে পারি, তবে তা ভালো। আর যদি আমাদের কঠিন উপায়ে করতে হয়, তবে সেটাও ভালো।

মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ কি আইনগতভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে?

ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছেন,প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি মার্কিন সংবিধানও লঙ্ঘন করে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক এবং আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, মারাত্মক নৌকা দুর্ঘটনা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মাদক বহনের অভিযোগে নৌকায় থাকা সমস্ত যাত্রীকে হত্যা করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

যদিও হেগসেথ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং প্রতিবেদনটিকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মিথ্যা ও উসকানিমূলক এই প্রতিবেদনের লক্ষ্য ছিল ‘স্বদেশকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধরত অবিশ্বাস্য যোদ্ধাদেরকে অসম্মানিত করা’। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ক্যারিবীয় অঞ্চলের হামলাগুলো ‘আইনসম্মত’।

এদিকে, মার্কিন কংগ্রেস শনিবার এসব হামলার ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল গত অক্টোবরে ফক্স নিউজ সানডেকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি সেগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলব।’

মার্কিন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন একমত পোষণ করেছেন র‌্যান্ড পলের সঙ্গে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের অধীনে সহযোগী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে কাজ করা ফেইন বলেন, ‘ট্রাম্প সংবিধানের বাইরে কাজ করছেন এবং খুন করছেন’।

ফেইন আরও বলেন, শুধু কংগ্রেসই সামরিক বাহিনীর আক্রমণাত্মক ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারে এবং এই বিষয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

কার্টেল দে লস সোলস ১৯৯০-এর দশকে আবির্ভূত হয়েছিল যখন ভেনেজুয়েলার জেনারেল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাদক পাচার এবং এ সম্পর্কিত অপরাধের জন্য তদন্তের অধীনে এসেছিলেন। ভেনেজুয়েলায় এটি কোনো কার্টেল নয় বরং দুর্নীতি এবং অন্যান্য অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত সামরিক কর্মকর্তা ও পদাধিকারীদের একটি সাধারণ রেফারেন্স।

তবে ট্রাম্পের অনুসাীদের অনেকেই বিদেশে সামরিক অভিযানের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এসব অভিযানকে ব্যয়বহুল, বিভ্রান্তি এবং মার্কিন সম্পদের অপচয় হিসাবে দেখছেন তারা। তেহরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে এই বছরের শুরুতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা চালায় তখন এই ভয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

সূত্র: আলজাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights