ডেঙ্গুতে ঝুঁকিপূর্ণ যারা

ডা. মো. আশরাফুল হক

ডেঙ্গুতে উচ্চঝুঁকির গ্রুপ রয়েছে। যাদের শরীরের ওজন বেশি আগে যাদের ডেঙ্গু হয়েছে এমন লোকজন এবং মহিলারা। যারা গর্ভবতী তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। ডেঙ্গু যেহেতু আমাদের দেশে নতুন নয়, তাই এসব তথ্য আমরা অনেকেই জানি। এটাও জানি ডেঙ্গুর লক্ষণ কী কী হতে পারে। সমস্যা হলো- গর্ভকালীন মহিলাদের শরীরে অনেক ধরনের পরিবর্তন আসে। গর্ভকালীন অবস্থায় ডেঙ্গু হলে তাই অনেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে বুঝতে পারেন না। মাথাব্যথা, বুক ও পেটের সংযোগস্থলে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব ইত্যাদি গর্ভকালীন উপসর্গ হলেও এগুলো ডেঙ্গুর লক্ষণ। আমরা সাধারণত জ্বর না হলে পরীক্ষা করাতে চাই না। তাই ডেঙ্গু হলেও বুঝতে পারি না। ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা দেখার জন্য আমরা যে পরীক্ষা করি তার মাঝে অন্যতম হলো NS1, যা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় হয়। লক্ষণ আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এ পরীক্ষা করা হলে পজিটিভ আসে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু এ বছর কেন জানি উপসর্গ থাকার পরও এ পরীক্ষা নেগেটিভ হিসেবেই পাওয়া যাচ্ছে অনেকের ক্ষেত্রে। ফলে ডেঙ্গু হলেও চিকিৎসা নিতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। আবার গর্ভকালীন স্বাভাবিকভাবে রক্তের কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন- প্রথম তিন মাসের ভিতরে রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে গতানুগতিকভাবে রক্তশূন্যতার মতো দৃশ্যপট হয় রক্ত পরীক্ষা করলে বিশেষ করে সিবিসিতে।

ডেঙ্গুর একটি জটিলতা হলো- রক্তের প্লাজমা বের হয়ে যাওয়া রক্তনালি থেকে শরীরের ভিতরে অন্য জায়গায়। যেহেতু রক্তশূন্যতা স্বাভাবিক হিসেবেই জানি আমরা প্রথম তিন মাসের ভিতরে। ফলে এ সময়ে ডেঙ্গুতে রক্তের প্লাজমা কমে যাওয়া শুরু হলে বুঝে উঠতে পারেন না অনেকেই। আবার পরের তিন মাসের দিকে প্লাটিলেট কমে স্বাভাবিকভাবে অনেকের। এই সময়ে কারও ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট কম দেখে অনেকেই আমরা খুব একটা নজর দিতে চাই না এ দিকটায়। কিন্তু ৮০ হাজারের নিচে নামলেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। গতানুগতিক ভেবে ধৈর্য ধরার সুযোগ নেই। ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা ফ্লুয়িড সেটা সবাই জানি কিন্তু গর্ভকালীন ফ্লুয়িড অনেক হিসাব করেই দেওয়া লাগে যেহেতু তার শরীরে ফ্লুয়িড এমনিতেই বেশি থাকে গাণিতিক হিসাবে। ফলে আমরা অনেকেই একটু বেশি সচেতন থাকতে চাই ফ্লুয়িড দেওয়ার বিষয়ে যা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত হতে পারে। রোগীর ঠিকমতো প্রস্রাব হচ্ছে কি না যা অঙ্কের হিসাবে প্রতি কেজির অনুপাতে ০.৫ মিলি করে প্রতি ঘণ্টায় (কমপক্ষে)। হিসাবটা রোগীর নিজের রাখতে পারাটাই এই অবস্থায় ভালো। কারণ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত রোগী দ্বারা পরিপূর্ণ। খেয়াল রাখতে পারলে ফ্লুয়িড কম হচ্ছে কি না তা বোঝা যায়। ফ্লুয়িড বেশি হয়ে গেলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় স্বাভাবিক অবস্থায়। গর্ভকালীন শ্বাসকষ্ট হওয়াটা অনেকটাই স্বাভাবিক অনেকের ক্ষেত্রে। ফলে এ জিনিসটা অনেকেই অবহেলা করতে পারেন। চিকিৎসক যদি খেয়াল রাখেন তাহলে বিপদ এড়ানো সম্ভব যদি নিয়ম করে ফুসফুস সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। রক্ত জমাট বাঁধার যে স্বাভাবিক নিয়ম রয়েছে তা ডেঙ্গুতে বাধাগ্রস্ত হয় লিভার আক্রান্ত হওয়ার কারণে। ডেলিভারির সময়ে অত্যধিক রক্তপাত হতে পারে এমন রোগীদের ক্ষেত্রে সেটা মাথায় রাখা দরকার। তাই রক্তের উপাদান সঠিকভাবে সঠিক সময়ে করা জরুরি। প্লাটিলেটের দিকে অধিক মনোযোগ থাকায় অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশেষ করে প্লাজমার দিকে আমাদের নজর থাকে না অনেক সময়ই। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে এর ব্যবহার জীবন যেমন বাঁচিয়ে দিতে পারে, তেমনি হাসপাতাল থেকে তুলনামূলক দ্রুত রোগী ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। মোদ্দা কথা, গর্ভকালীন ডেঙ্গুকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবেই দেখা উচিত এবং নিয়মিত চিকিৎসকের অধীনে থাকাটা একান্ত জরুরি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights