ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত তরুণরা
জয়শ্রী ভাদুড়ী
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাকিল হাসান রাজধানীর কালাচাঁদপুরের একটি মেসে থাকেন। জ্বরের সঙ্গে শরীরে ভীষণ ব্যথা হলে এনএস১ টেস্ট (ডেঙ্গু টেস্ট) করান। রিপোর্ট ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। শাকিল বলেন, ‘দুই দিন আগে শরীর ভীষণ খারাপ লাগছিল, রাতে জ্বরে আক্রান্ত হই। নিয়মিত মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই। তার পরও কোথা থেকে যে মশায় কামড়াল বুঝতে পারছি না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যসূত্রে জানা যায়, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের বড় অংশই ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সি। গতকালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বয়সসীমায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৪৩৪ জন, যা এ বছর মোট আক্রান্তের প্রায় ৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগীর চাপও বাড়ছে। বিভাগগুলোর মধ্যে বরিশালে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গুতে বিভিন্ন বয়সি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তরুণরা কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। অনেক সময় অপরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশে থাকেন। এ কারণে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাসের কারণে শিশুরাও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে জোর দিতে হবে। শুধু জমে থাকা পানি অপসারণ নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। জ্বরের শুরুতেই বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা যায়। শুধু শিশুদের মশারির মধ্যে রাখলেই হবে না; পুরো পরিবার ও আশপাশের পরিবেশ মশামুক্ত করলেই কেবল ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৪৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩ হাজার ৮৮৬, নারী ৮ হাজার ৫৫২ জন। অর্থাৎ আক্রান্তের প্রায় ৬২ শতাংশই পুরুষ। চলতি বছরে এডিস মশার কামড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৫ জন।
তরুণদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬-৩০ বছর বয়সিরা। এ বয়সে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ১৪০ জন। এর পরেই ২১-২৫ বছর বয়সে ৩ হাজার ১৩১ জন এবং ১৬-২০ বছর বয়সে ২ হাজার ৯৬৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩১-৩৫ বছর বয়সি ২ হাজার ১৯৭ এবং ৩৬-৪০ বছর বয়সি ১ হাজার ৯৯৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সি মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৩৪, মোট আক্রান্তের প্রায় ৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন শুধু শিশু বা বয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মজীবী তরুণদের বড় একটি অংশ আক্রান্ত হওয়ায় পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে এর প্রভাবও বাড়ছে।
ঢাকার বাইরে বরিশালে সবচেয়ে বেশি রোগী : দেশের বিভিন্ন বিভাগেও ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ ক্ষেত্রে চলতি বছরে বরিশাল বিভাগ শীর্ষে অবস্থান করছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ১৭২, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ হাজার ৭৫১, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশন বাদে) ৩ হাজার ২৫, খুলনা বিভাগে ২ হাজার ৯৫৯ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ২ হাজার ৬০২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত ১ হাজার ১২, রংপুরে ৪৮৯ ও সিলেটে ১৩১ জন।
এক দিনেই হাসপাতালে ভর্তি ২০০ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দেশে নতুন করে ২০০ ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে কোনো ডেঙ্গুরোগীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ৫ হাজার ৭২৪ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে ৪ হাজার ৩৭২ এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১ হাজার ৩৫২ জন চিকিৎসাধীন।
রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ৩৪২ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি রয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৭০, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৫৯ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৩৬৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন।
