ঢাকার সড়ক ঘেঁষে মলমূত্র ছড়াচ্ছে রোগজীবাণু

নাহিদুর রহমান হিমেল ও আশিক উল বারাত

চিত্র ১ : ১১ মে সোমবার, বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে কয়েকজন বিদেশি পর্যটক গাড়ি নিয়ে খিলক্ষেত পার হচ্ছিলেন। হালকা যানজটে স্থির হয়ে পড়ে তাদের গাড়িটি। ঠিক সে সময় রাস্তার পাশে ফুটপাত ঘেঁষে সেখানে বসে মূত্রত্যাগ করছিলেন দুই যুবক। বিষয়টি দেখে সেই পর্যটকরা কিছুটা মুচকি হাসলেন। বোঝাই যাচ্ছিল হাসিতে ছিল কিছুটা অবজ্ঞার ভঙ্গি। তাদের গাড়ির পাশে ছিলেন মোটরসাইকেল চালক ফরিদুজ্জামান। বিষয়টি নিয়ে তিনিও বিব্রত হন। প্রশ্ন তোলেন, দেশে ঢুকেই যদি বিদেশি পর্যটকরা এসব দেখেন তাহলে দেশের সম্মান কোথায় থাকে?

চিত্র-২ : ১৩ মে বুধবার সকাল সাড়ে ৭টা। ফার্মগেট এলাকায় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের পাশ ঘেঁষে চলা ফুটপাতের দেয়াল ঘেঁষে মূত্রত্যাগ করছিলেন এক যুবক। সেই মূত্র ফুটপাত গড়িয়ে চলে আসে সড়কে। পাশ দিয়ে হেঁটে সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন এক মা। বিষয়টি দেখে সন্তানের নাক চেপে ধরে চোখ আড়াল করে মূত্র ডিঙ্গিয়ে চলে যান তিনি।

চিত্র-৩ : ১৪ মে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা। রাজধানীর সচিবালয় থেকে প্রটোকল সহকারে কোনো একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বেরিয়ে গেলেন। থামলেন জিরো পয়েন্ট সিগন্যালে। ঠিক সে সময় পীর ইয়ামেনি মার্কেটের পেছনের কর্নারে ওসমানী উদ্যানের সীমানা গ্রিল বরাবর মূত্রত্যাগ করছিলেন এক যুবক। ‘এখানে কেন এই কাজ’- এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক বলেন, ‘অবদুল্লাহপুর থেকে বাসে উঠছি ভাই, জ্যামের কারণে দুই ঘণ্টা লাগছে আসতে। বাসের মধ্যেই চাপ দিছিল, উপায় না পেয়ে চেপে রেখে এখানে নেমেই ছাড়তে হলো।

মিরপুরে ইসিবি চত্তরের পাশে ফুটপাতের দেয়াল ঘেঁষে মূত্রত্যাগ করছেন এক যুবক।
শুধু এই তিনটি চিত্রই নয়, রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, ফুটপাত, উড়ালসড়কের নিচ, বাসস্ট্যান্ড কিংবা মার্কেটসংলগ্ন দেয়াল-প্রায় সর্বত্রই প্রকাশ্যে মলমূত্রত্যাগের দৃশ্য এখন যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে বাসচালক-হেলপার, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলচালক, ভ্রাম্যমাণ হকার এবং পথচারীদের একটি অংশ ফুটপাত কিংবা রাস্তার পাশকেই ব্যবহার করছেন অস্থায়ী ‘টয়লেট’ হিসেবে। এতে একদিকে যেমন দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ নগরবাসী, অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ছে রোগজীবাণু ও পরিবেশদূষণ।

রাজধানীর ফার্মগেট, মহাখালী, গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মিরপুর-১০, কারওয়ান বাজার, সদরঘাট, উত্তরা, কমলাপুর এবং সচিবালয়, সিরডাপ, শিক্ষাভবন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন দেয়াল ও ফুটপাতের কোণে নিয়মিত মলমূত্রত্যাগের কারণে সেসব স্থান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও দেয়ালে ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ’ লেখা থাকলেও তা মানছেন না অনেকেই।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটা অংশ নারী যাত্রীরা। কারণ, রাস্তায় দীর্ঘসময় থাকলেও পুরুষদের মতো তারা প্রকাশ্যে কোথাও মূত্রত্যাগ করতে পারেন না। রাজধানীর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তানিয়া আক্তার বলেন, ঢাকার রাস্তায় বের হলে সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি হলো টয়লেট। পুরুষরা অন্তত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সেরে নিতে পারে, কিন্তু নারীদের সেই সুযোগ নেই। অনেক সময় বাসে বা যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হয়।

কাফরুল থানার এসআই হোসনা আফরোজ বলেন, এই সমস্যা নিয়ে অনেকবার বিভিন্ন স্থানে কথা বললেও আসলে প্রতিকার পাওয়া যায় না। তাই বলতেও ইচ্ছে করে না। দেখা যায়, বেশির ভাগ সময়েই তো চেপে রাখা লাগে কিন্তু যখন আর সহ্য করতে পারি না তখন কোনো কমিউনিটি সেন্টার, বাসার নিচ তলায় প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয়।

নগরবাসীর অভিযোগ, দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং অনেক স্থানে পাবলিক টয়লেট অচল, অপরিচ্ছন্ন বা দখল হয়ে আছে। ফলে বাধ্য হয়েই কেউ কেউ খোলা জায়গা ব্যবহার করছেন।

উন্মুক্ত স্থানে মূত্রত্যাগ শুধু দৃষ্টিকটু নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর বিস্তার বাড়ে, যা বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনিসেফ ও ওয়াটারএইডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য খোলা পরিবেশে মিশে যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও সড়কে কথা হয় কয়েকজন চালক ও হকারের সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকতে হয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময় আশপাশে ব্যবহারযোগ্য টয়লেট পাওয়া যায় না। কোথাও টয়লেট থাকলেও তা নোংরা, পানিশূন্য কিংবা তালাবদ্ধ থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানী পরিবহনের এক বাসচালক বলেন, ?‘কী করমু কন, উপায় নাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালাই। সব জায়গায় তো আর টয়লেট পাই না। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে হয়।’

ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা ইসমাইল বলেন, ‘অনেক পাবলিক টয়লেটে ঢুকতেই কষ্ট হয়। গন্ধে থাকা যায় না। তাই অনেকে বাইরে সেরে নেয়।’

তবে শুধু টয়লেট সংকট নয়, নাগরিক অসচেতনতা ও দীর্ঘদিনের ‘অভ্যাস’ও বড় কারণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অনেকেই কাছাকাছি টয়লেট থাকা সত্ত্বেও রাস্তার পাশে মূত্রত্যাগ করেন।

বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জনসংখ্যার তুলনায় ঢাকায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অত্যন্ত কম। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, নগরীর অধিকাংশ পাবলিক টয়লেটই অস্বাস্থ্যকর ও ব্যবহার অনুপযোগী।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল বলে মনে করছেন নগরবাসী। কোথাও কোথাও টয়লেট দখল, অব্যবস্থাপনা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার কমে গেছে। এমনকি কিছু এলাকায় পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট উচ্ছেদের ঘটনাও ঘটেছে।

এভাবেই প্রতিনিয়ত নষ্ট করা হয় রাজধানীর ফুটপাত -সংগৃহীত
পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড, বাজার, ফুটপাতঘেঁষা এলাকা ও পরিবহন টার্মিনালে পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট স্থাপন জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, পানির ব্যবস্থা ও মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া শুধু অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতামূলক প্রচারণা, পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, রাজধানীকে বাসযোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে সড়ক ঘেঁষে মূত্রত্যাগ বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights