তিন মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম

জয়শ্রী ভাদুড়ী

দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের তিন মাস পার হলেও ভাইরাসবাহিত এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। এই সময়ে ৬৮৩ প্রাণ কেড়েছে হাম। এর সবাই শিশু। হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে ৫৯০ শিশু, আর নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ শিশু। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহ ও নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬-এ। দেশে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হামের রোগী শনাক্ত বেশি হতে থাকে। তবে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় মার্চ মাস থেকে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর অবস্থা বেগতিক হওয়ায় পরিস্থিতিকে আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) ঘোষণা করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিন মাসের বেশি সময় ধরে হামের প্রাদুর্ভাব চললেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার পেছনে টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘টিকাদান কার্যক্রম যখন শুরু হয়, তখনই আমরা বলেছিলাম যথেষ্ট প্রচারপ্রচারণা ছাড়াই যেভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়াই কঠিন। কারণ এটা অন্য টিকার মতো না যে কাভারেজ কিছু কম হলেও কাজ হবে। হামের টিকার কাভারেজ ৯৫ ভাগের কম হলে এর সংক্রমণ হতে থাকবে, আর এবার সেই ঘটনাটাই ঘটেছে।’ এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, ‘এটা সাধারণ টিকার মতো না। হামের টিকা ৯ মাসে এবং ১৫ মাসে দেওয়া হয়। কিন্তু এই টিকা তো দেওয়া হচ্ছে ৬ মাস থেকে তাহলে বয়স পরিবর্তন হয়েছে। আবার দেওয়া হচ্ছে ৫৯ মাস পর্যন্ত, তার মানে ১৫ মাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। এই যে পরিবর্তনগুলো তা অনেক মা জানেন না, কেননা তাঁদের জানানোর জন্যে ব্যাপক প্রচার হয়নি। দ্বিতীয়ত অভিভাবকদের দ্বিধা থাকবে যে ৯ মাসের জায়গায় ৬ মাসে টিকা দেব, কোনো ক্ষতি হবে না তো! কিংবা ৯ মাসের জায়গায় ৫৯ মাসে টিকা দেব-আমার শিশুর কোনো ক্ষতি হবে না তো! এই বিষয়গুলো যদি আগে থেকে রেডিও, টিভি, মাইকিং, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করতেন, তাহলে টিকার কাভারেজ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আমার ধারণা বহু পকেট রয়েছে-যেখানে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়া যায়নি। এর ফলেই ভাইরাসের সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না। যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এই পরিস্থিতি অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হয়ে একটি চক্রে পরিণত হয়েছে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বগুড়া, ময়মনসিংহ এবং কক্সবাজারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

এ সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৬৫ এবং হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬০ শিশুর। হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে তাতে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। মহামারি যেভাবে মোকাবিলা করা হয়, সেভাবে কাজ করতে হবে। প্রাইমারি কেয়ার, সেকেন্ডারি এবং আইসিইউ এভাবে স্তরবিন্যাস করে সেবা দিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে অপুষ্টির শিকার শিশুদের শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে। নয়তো দেখা যাচ্ছে একদিকে টিকা দিচ্ছে আরেকদিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, টিকা দেওয়ার জন্য মাইক্রোপ্ল্যানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় এই টিকা ক্যাম্পেইনে সরকার পরিকল্পনা করার সময় পায়নি। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ না করলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights