থামছে না মাদকের থাবা
সাখাওয়াত কাওসার
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে বর্তমানে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর উপস্থিতির মধ্যেই কয়েক হাজার মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে রাজধানীর ৩ শতাধিক স্পটে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর ও পল্লবীর জেনেভা ক্যাম্পে অনেকটাই প্রকাশ্যে চলছে মাদক কারবারিদের বিচরণ। এ যেন মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধিপত্য ধরে রাখতে মাদক কারবারিদের কাছে রয়েছে অস্ত্রের মজুত। এতে এসব হটস্পটে মাঝেমধ্যেই ঘটছে খুনোখুনি। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক যুবসমাজকে বিপথে ধাবিত করছে। ফলে অপরাধ বাড়ছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ নজর দিতে হবে। সরেজমিনে জানা গেছে, রাতে জেনেভা ক্যাম্পের প্রতিটি এলাকার গলিতে এখনো প্রকাশ্যে চলছে মাদকের কারবার। এখানে সক্রিয় শীর্ষ মাদক কারবারির বিরুদ্ধে এলাকার লোকজন কথা বলতে ভয় পান। কারণ মাদকের পাশাপাশি তাদের কাছে রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র, যা যে কোনো মুহূর্তে প্রাণহানি ঘটাতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কয়েকজন এ প্রতিবেদককে বলেন, এলাকায় এখনো মাদকের রমরমা কারবার চলছে। বিশেষ করে রাতে টহলে পুলিশ সদস্যদের তেমন উপস্থিতি নেই। এর সুযোগ নিচ্ছেন মাদক কারবারিরা।
রাজধানীতে বর্তমানে শীর্ষ মাদক কারবারিরা ৫৭ গ্রুপে ভাগ হয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করছে সাতটি গ্রুপ। তাদের রয়েছে ৩ শতাধিক সদস্য। অন্তত ৬৫ জন শীর্ষ মাদক কারবারি তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন আরশাদ, পিচ্চি রাজা, শাহজাদা, বড় রাজা, পেলু আরমান ও মুন্না। তাদের রয়েছেন ৬৫ জনের বেশি সদস্য। অন্য গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছেন ভাঙারি আরজু, তোতে, কামরান, সাজু, আদিল ও ফাইজান। এদের রয়েছেন অন্তত ৪৭ জন সদস্য। আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন বুনয়া সোহেল, রানা, টুনটুন, কামাল, কালা, শহীদ ও রাব্বানি। তাদেরও ৫৩ জনের বেশি সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া অন্য আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন গাল কাটা মনু, শাহ আলম, ইমতিয়াজ, আকরাম, চউরা জানু, বিল্লু, সাবু, বাসির ও ইরফান। এদেরও ৬১ জনের বেশি সদস্য রয়েছেন। আরেক গ্রুপের নেতৃত্বে বাবু, সাদ্দাম, মনু, মোফিজ, সুমন, রাজু, নাদিম ও জাম্বু। এদের বেশির ভাগ এখনো ধরা পড়েননি বলে জানিয়েছে পুলিশ। র্যাব-পুলিশের সূত্র জানিয়েছেন, জেনেভা ক্যাম্পে একাধিক টিমের কড়া নজরদারি চলছে। মাদক কারবারের তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ ১৫ দিনে জেনেভা ক্যাম্পসহ আশপাশ এলাকা থেকে ১৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত ক্যাম্পে মাদকবিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছে। তার পরও ক্যাম্প থেকে মাদক নির্মূল করা যাচ্ছে না।
পুলিশ বলছে, ক্যাম্পের অন্তত ৬৫ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত বলে তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সর্বশেষ ১৪ নভেম্বর রাতে ক্যাম্পের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ককটেল-বোমার আঘাতে মারা যান শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেল গ্রুপের সদস্য রাজ ওরফে ইকবাল। সরেজমিনে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, আগে ক্যাম্পে প্রকাশ্যে মাদকের কারবার চললেও কয়েক দিন ধরে কিছুটা আড়ালে-আবডালে। ক্যাম্প ঘিরে থাকা গজনবী রোড, বাবর রোড, শাহজাহান রোড, হুমায়ুন রোডে রয়েছে পুলিশের ক্যাম্প, তল্লাশি চৌকি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব তৎপরতার তোয়াক্কা করছেন না ক্যাম্পে বসবাসকারীরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. রুহুল কবির খান বলেন, ‘মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পসহ আশপাশ এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। মাদক কারবারির বেশির ভাগই কিশোর-তরুণ গ্যাংয়ের সদস্য। গ্রেপ্তার একেকজনের বিরুদ্ধে তিন থেকে ২৫টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, অভিযানের কারণে মোহাম্মদপুরে অপরাধমূলক কর্মকা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র বলছেন, রাজধানীর ছয়টি এলাকাকে মাদকের রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রেড জোনে রয়েছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মহাখালীর কড়াইল বস্তি, কালশী বিহারি ক্যাম্প, কারওয়ান বাজার, খিলগাঁও ও যাত্রাবাড়ী। এ ছাড়া ইয়েলো ও গ্রিন জোনের তালিকায় রয়েছে পুরো রাজধানী।
এদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকাও মাদকের মারাত্মক ছোবলের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তাসংলগ্ন বাজারের পেছনের এলাকা, মধ্যপাড়া কাঁচাবাজারের মুরগির গলি, চন্দনকোঠা, টানপাড়া, বিদ্যুৎ গলি এলাকায় বর্তমানে মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। এমনকি নিকটবর্তী গেন্ডারিয়া, ধুপখোলা, জুরাইন থেকেও কিশোর-তরুণরা মাদকের খোঁজে এসব এলাকায় ভিড় জমাচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, যাত্রাবাড়ীতে মাদকের নিয়ন্ত্রণ করছেন একটি রাজনৈতিক দলের যুব সংগঠনের এক নেতা। জানা গেছে, যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাঝেও দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা হয়ে ঢাকায় ঢুকছে নানা ধরনের মাদক। সড়ক, নদী, সাগর ও আকাশপথে প্রতিনিয়ত রাজধানীতে ঢুকছে নানান নেশাদ্রব্য। ডিএনসি কর্মকর্তা (অপারেশন্স ও গোয়েন্দা) তানভীর মমতাজ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে এর সফলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রতিনিয়ত অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা দেওয়ার মাধ্যমে মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।’ ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত ফুট প্যাট্রল ও ব্লক রেইড হচ্ছে।’ এ বিষয়ে এসপিজিআরসির সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মাদক কারবার চলছে। এখানে বসবাসকারীরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জীবিকার তাগিদে তারা ঝুঁকি নিয়ে মাদক কারবারের মতো অপরাধে জড়িয়েছেন।’ ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পের ভিতরে মাদকসংশ্লিষ্ট ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একাধিক গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। শুনেছি বিভিন্নভাবে ক্যাম্পে কিছু অস্ত্র ঢুকেছে। ক্যাম্পে সংঘর্ষ ঠেকাতে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম ও অভিযান চলমান আছে।’
