দখল দূষণে তিতাস নদ এখন খাল

মোশাররফ হোসেন বেলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

কালজয়ী ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে তিতাসের কূল ভরা জল, বুক ভরা ঢেউ আর প্রাণ ভরা উচ্ছ্বাসের কথা বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু তিতাসের সেই ভরা যৌবন আর নেই। দখল আর দূষণে দিনদিন জরাজীর্ণ খালে পরিণত হচ্ছে তিতাস।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, তিতাস নদ ঘিরে একসময় সমৃদ্ধ ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসাবাণিজ্য, কৃষিসহ এলাকার অর্থনীতি। জেলার নাসিরনগরে মেঘনা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে জেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে বাঞ্ছারামপুরে আবার মেঘনায় মিলিত হয়েছে তিতাস নদ। জেলার নয় উপজেলার আটটির মধ্য দিয়েই তিতাস প্রবহমান। এ নদ দিয়ে বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার ও নৌকায় এ অঞ্চলের মানুষের চলাচলসহ ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালিত হতো। লঞ্চের শব্দ আর বড় বড় পালতোলা নৌকার মাঝিমাল্লাদের ধ্বনিতে তিতাসপারের মানুষের ঘুম ভাঙত।

এ নদ ছাড়া জেলার অস্তিত্ব চিন্তাও করা যায় না। তিতাস ঐতিহ্য-গৌরবের ধারকবাহক এবং ইতিহাসের সাক্ষী কালজয়ী নদ। খনন করার পরও তিতাসের সেই উত্তাল যৌবন এখন আর নেই। একসময়ের খরস্রোতা তিতাস এখন প্রায় মরা খাল। খননের বছর না পেরোতেই আবারও ডুবোচর জেগে ওঠে। নাব্য হারিয়ে তিতাস এখন জীর্ণশীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। ১১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে নদটির ১০৩ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন স্থানে পলি জমে ও চর পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দখলদাররা পৌর এলাকার আনন্দবাজার, মেড্ডা, শিমরাইলকান্দি, সদর উপজেলার উজানিশারসহ নদের দুই পাশে গড়ে তুলেছেন অবৈধ স্থাপনা ও দালানকোঠা। এতে নদ সরু হয়ে নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল।

১৩৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিতাস নদের খননকাজ শুরু হয়। পাঁচ প্যাকেজে তা শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। স্থানীয়রা জানালেন, তিতাসে নামের সঙ্গে এ জেলার পরিচয়। খনন করার পরও ভরা যৌবন ফিরে আসেনি। এবার ভরা বর্ষা মৌসুমেও তিতাস প্রাণ ফিরে পায়নি। তাদের দাবি, খননকাজ সঠিকভাবে হয়নি। হয়েছে সরকারি অর্থ লুট ও বালুর ব্যবসা।

জেলে রবিদাস জানান, ‘নদে এখন আর আগের মতো পানিও নেই, মাছও নেই। নদ শুকিয়ে যাওয়ায় আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।’

লঞ্চচালক সিরাজ মিয়া জানান, ‘৪০ বছর ধরে লঞ্চ চালাই। তিতাসের বুকে পানির যে উত্তাল ঢেউ ছিল তা এখন আর চোখে পড়ে না।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত জানান, তিতাস নদটি খনন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, খননকাজটি ভালো হয়েছে। তবে পলি জমে তিতাসের তলদেশ দিনদিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights