দালালের ওয়ানস্টপ সার্ভিস!

সুদীপ্ত দাস
রবিবার (১৬ আগস্ট) সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের গেটে যেতেই এগিয়ে আসেন ইবরাহীম নামে এক ব্যক্তি (দালাল)। জানতে চান পাসপোর্টের কাজ করাব কি না। নতুন পাসপোর্ট করব জানাতেই দেন ডকুমেন্ট ও খরচের বিবরণ। ইবরাহীমের ভাষ্য, ‘আপনি যে এলাকার বাসিন্দা হন না কেন শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) হলেই পাসপোর্টের সব কাজ হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ বিলের কপি আমরাই তৈরি করে দেব।’ ১০ বছর মেয়াদি জরুরি ডেলিভারির (১০ দিন) জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হবে ৮ হাজার ৫০ টাকা, আবেদন ও টাকা জমা ফি ৪০০ টাকা, অফিসের ভিতরে স্যারদের খরচ ৩ হাজার টাকা। যদি ভিআইপিভাবে জমা দিতে চান তাহলে আরও ১৫০০ টাকা, সব মিলিয়ে ১২ হাজার টাকা দিলেই আবেদন জমা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি আজই করতে পারবেন। কোনো সিরিয়াল ধরতে হবে না। আমরা ফোনে বলে দেব, আপনি যাবেন সব ওরাই (কর্মকর্তারা) করে দেবে। আর যদি নিজে জমা দিতে চান তাহলেও দিতে পারেন। তবে পদে পদে ভুল ধরবেন কর্মকর্তারা।’ টাকা অনেক বেশি জানালে ইবরাহীম বলেন, ‘এই টাকায় করাতে চাইলে আমাকে বইলেন। আর পাসপোর্টসংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে সমস্যার সমাধান করে দিতে পারব।’

অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে পাসপোর্টের সব সেবা অনলাইন করা হলেও এখনো কমেনি দালালদের দৌরাত্ম্য। কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও দালালদের ঠেকানো যাচ্ছে না। নতুন কৌশলে সক্রিয় হচ্ছেন তারা। এক ছাতার নিচে থেকেই দিচ্ছেন সব সার্ভিস। গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট নবায়ন, আবেদনে ভুলসহ সব কাজই করে দিচ্ছেন দালালরা। বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। গতকাল সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস ও কার্যালয়ে সরেজমিন অবস্থান করে দেখা গেছে, পাসপোর্ট অফিসের ভিতর দালালদের ঢুকান নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা। ‘স্যারের লোক’ বলে তাদের ওপরে নিয়ে যান তারা। আনসারদের অফিসের সামনে গড়ে ওঠা দোকানিদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরপর দোকানে গিয়ে চা-সিগারেট খাচ্ছেন এবং দোকান থেকে বিভিন্নজনের আবেদন বা ডকুমেন্ট নিয়ে ভিতরে যাচ্ছেন।

পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটক থেকে শুরু করে আশপাশের ফুটপাতজুড়ে দেখা যায় দালালদের সরব উপস্থিতি। নতুন কেউ অফিসের সামনে নামলেই তারা জানতে চাইছেন, নতুন পাসপোর্ট নাকি নবায়ন, জরুরি নাকি সাধারণ, কাগজপত্র সম্পূর্ণ আছে কি না। এর পরই শুরু হয় ‘সহযোগিতার’ প্রস্তাব। কয়েকজন দালাল নিজেদের ‘অভিজ্ঞ’ পরিচয় দিয়ে বলেন, নিজে গেলে অনেক ঝামেলা হবে, আমাদের মাধ্যমে করলে একবারেই হয়ে যাবে। আসেন আমাদের দোকান আছে এখানে।

জহিরুল ইসলাম নামে একজন আবেদনকারী বলেন, ‘আমি নিজেই আবেদন করতে এসেছিলাম। প্রথম দিন ছবি নিয়ে আপত্তি, দ্বিতীয় দিন ঠিকানার বানান, তৃতীয় দিন আবার অন্য একটি কাগজে সমস্যা দেখানো হয়। পরে এক দালাল বললেন, ৩ হাজার টাকা দিলে আর কোনো সমস্যা হবে না। তার মাধ্যমে জমা দেওয়ার পর একই কাগজপত্রেই আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে।’ সালাহ উদ্দিন নামে ভুক্তভোগী বলেন, ‘এখানে নিয়মের চেয়ে দালালের পরিচয় বেশি কার্যকর। টাকা দিলে ভুলও ঠিক হয়ে যায়, আর না দিলে সামান্য বিষয় নিয়েও ঘুরতে হয়।’ তবে পাসপোর্ট নিতে আসা গোলাম সামদানি বলেন, ‘আবেদন ও কাগজপত্র ঠিক থাকলে কোনো সমস্যা হয় না। আমি নিজেই নিজেরটা আবেদন করেছি। কোনো সমস্যা হয়নি। কার্যালয়ের ভিতর দালাল না দেখলেও গেটের সামনে তাদের রাজত্ব দেখা যায়।’

অফিসের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কিছু আনসার সদস্যের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাপ্রত্যাশী। তাদের দাবি, কিছু দালালকে ‘স্যারের লোক’ পরিচয়ে অফিসে প্রবেশে সহায়তা করা হয়। এমনকি লাইনে না দাঁড়িয়েও তারা নির্দিষ্ট কক্ষে ঢুকে আবেদনকারীদের নিয়ে বেরিয়ে আসেন। কয়েকজন আবেদনকারী অভিযোগ করেন, অগ্রাধিকার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনও হয়। একজন প্রবীণ আবেদনকারী বলেন, ‘আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। অথচ কিছু লোক কোনো বাধা ছাড়াই ভিতরে ঢুকে যায়। পরে জানতে পারি, তারা দালাল।’

এদিকে গতকাল সরেজমিন পাসপোর্টের সরকারি ফি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু ব্যতিক্রম চিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারী নিজেই অনুমোদিত ব্যাংক বা অনলাইন মাধ্যমে ফি পরিশোধ করবেন। কিন্তু কয়েকজন আবেদনকারী জানান, দালালরা তাদের ব্যাংকে যেতে নিরুৎসাহিত করেন। বরং নিজেদের পরিচিত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে আবেদনকারীরা পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অন্ধকারেই থেকে যান এবং সরকারি ব্যবস্থার পরিবর্তে দালালচক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সরেজমিন দেখা যায়, অফিসের বাইরে দালালবিরোধী বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যানার টাঙানো রয়েছে। সেখানে লেখা, ‘দালালের খপ্পরে পড়বেন না’, ‘নিজেই আবেদন করুন’, ‘দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করুন’। একই সঙ্গে কিছু দালালের ছবি সংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যানারে লেখা রয়েছে ‘চিহ্নিত এই দালালসহ অন্য প্রতারকদের থেকে সতর্ক থাকুন।’ কিন্তু বাস্তবে সেই সতর্কবার্তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে দালালদের বিচরণই প্রমাণ করে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন) এ টি এম আবু আসাদ। তিনি জানান, গ্রাহক ঘরে বসে অনলাইনেই সবকিছু করতে পারেন। কেবল ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি দিতে সংশ্লিষ্ট অফিসে আসতে হবে। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অফিসে এসে পাসপোর্ট নিয়ে যেতে পারবেন। আমাদের প্রতিটি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে নজরদারি রয়েছে। তাদের তৎপরতা জানামাত্র পুলিশ-র‌্যাবকে অবহিত করা হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আবেদনকারীদের সচেতন হতে হবে। সঠিকভাবে আবেদন করে তারা নিজেরাই আবেদন জমা দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights