দিনাজপুরের পাঁচ উপজেলায় স্কুল ফিডিং এর আওতায় প্রায় ৬৫ হাজার শিশু
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি:
ক্ষুধা ও পুষ্টির ঘাটতি দূর করে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে দিনাজপুরের পাঁচ উপজেলায় চলছে ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচি। কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬৫ হাজার শিশু খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, নিয়মিত টিফিন দেওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগে পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ধারণে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিরামপুর, ঘোড়াঘাট, কাহারোল, বিরল ও বোচাগঞ্জ উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো-সোশাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ উপজেলার ৬০২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৭২ হাজার ৪৭৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯০ শতাংশ উপস্থিতির হিসাব ধরে ৬৪ হাজার ৯৯৮ জন এ খাদ্য সহায়তার আওতায় রয়েছে।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে কর্মসূচিটি চালু হয়। কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহের পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের দুটি বনরুটি ও একটি সিদ্ধ ডিম এবং এক দিন কলা ও বনরুটি দেওয়ার কথা রয়েছে। বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে এসব খাবার বিতরণ করা হয়।
সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয়ে দেখা যায়, টিফিন বিতরণের সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। খাবার পাওয়ার পর তারা বিদ্যালয়েই টিফিন খাচ্ছে। শিক্ষকরা জানান, আগে অনেক শিক্ষার্থী সকালে পর্যাপ্ত খাবার না খেয়ে বিদ্যালয়ে আসত। বেলা বাড়ার সঙ্গে ক্ষুধার কারণে বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। কেউ কেউ খাবারের জন্য বাড়ি চলে যাওয়ার পর আর বিদ্যালয়ে ফিরত না।
শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, স্কুল ফিডিং চালুর পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত টিফিন পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। এতে ক্ষুধাজনিত অস্বস্তি কমার পাশাপাশি ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে উপস্থিতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খাবারের পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক অবস্থা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মানসহ অন্যান্য কারণও কাজ করে বলে মনে করেন তিনি।
কাহারোল উপজেলায় ১২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৩ হাজার ১০৭ জন শিক্ষার্থী কর্মসূচির আওতায় রয়েছে বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
ইএসডিওর দিনাজপুর জেলার স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহ্ মোঃ আমিনুল হক বলেন, খাবার সরবরাহের কাজে ১৯২ জন নারী উদ্যোক্তা যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের সপ্তাহে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত মুনাফা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়ে খাবার দেওয়ার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানের সময় প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করায় কর্মসংস্থানের একটি সুযোগও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, তবে কর্মসূচির কার্যকারিতা যাচাইয়ে শুধু উপস্থিতির পরিবর্তন নয়, শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত অবস্থা, শিখনফল, ঝরে পড়ার হার, খাবারের মান ও পরিমাণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কারণ কর্মসূচির সুফল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হচ্ছে, তা নির্ধারণে এসব সূচকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সরকার আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। সম্প্রতি দিনাজপুরে এক কর্মশালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
