দিনে ব্যস্ত মৎস্যবন্দর, রাতে ‘আলোর শহর’ খাপড়াভাঙ্গা নদী
উত্তম কুমার হাওলাদার, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খাপড়াভাঙ্গা নদী দিনের বেলায় দেশের অন্যতম ব্যস্ত মৎস্যাঞ্চল। নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দরকে কেন্দ্র করে সারাদিন চলে মাছের বেচাকেনা, ট্রলারের আনাগোনা এবং জেলে-ব্যবসায়ীদের নিরন্তর কর্মব্যস্ততা। তবে সূর্যাস্তের পর এই কর্মচঞ্চল নদীই যেন রূপ নেয় এক মোহনীয় আলোর শহরে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নদীতে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা শত শত মাছ ধরার ট্রলারে জ্বলে ওঠে লাল, নীল, সবুজ ও সাদা রঙের বাতি। শান্ত নদীর জলে সেই আলোর প্রতিফলন সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর এক দৃশ্য। দূর থেকে মনে হয়, জলের বুকে ভেসে আছে আলোকসজ্জায় সজ্জিত একটি ছোট্ট শহর।
সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফেরা কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে আশ্রয় নেওয়া ট্রলারগুলো নিরাপত্তা ও কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন রঙের আলো জ্বালিয়ে রাখে। আর এই প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জাই এখন খাপড়াভাঙ্গা নদীকে পরিণত করেছে উপকূলীয় অঞ্চলের এক নতুন দর্শনীয় স্থানে।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কুয়াকাটা-কলাপাড়া সড়কের খাপড়াভাঙ্গা নদীর সেতুতে ভিড় করেন শত শত দর্শনার্থী। কেউ নদীর অপরূপ নৈশসৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ বা সেলফি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ছবি ও ভিডিও আরও বেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করছে।
কুয়াকাটা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সাফওয়ান হোসেন বলেন, ‘সমুদ্র সৈকত ঘুরে আমরা শুধু এই আলোর দৃশ্য দেখার জন্য এখানে এসেছি। কাছ থেকে দেখে মনে হয়েছে, বাস্তবে এটি ছবির চেয়েও অনেক সুন্দর।’
আরেক পর্যটক আজিজুর রহমান বলেন, ‘দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল নদীর মধ্যে আলোকসজ্জিত একটি শহর ভাসছে। কাছে এসে দেখি অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলারের রঙিন আলোর ঝলকানি। সত্যিই এটি অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা।’
স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুর রহমান জানান,‘আগে এখানে শুধু ট্রলার ভিড়ত। এখন সন্ধ্যা হলেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ঘুরতে আসে। ধীরে ধীরে জায়গাটি একটি বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।’
স্থানীয় সংবাদকর্মী মো. আনোয়ার হোসেন আনুর ভাষায়, ‘উপকূলের জেলেদের জীবনসংগ্রাম, নদীর শান্ত জলরাশি এবং হাজারো আলোর ঝলকানি, সব মিলিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় খাপড়াভাঙ্গা নদী যেন সৌন্দর্যের এক নীরব গল্প শোনায়। একবার এই দৃশ্য দেখলে সহজে ভোলা যায় না।’
স্থানীয়দের মতে, দেশের সামুদ্রিক মৎস্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দর। একই সঙ্গে রাতের এই অনন্য সৌন্দর্য পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরা গেলে খাপড়াভাঙ্গা নদী উপকূলীয় পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
তাদের দাবি, নদীতীরের সৌন্দর্যবর্ধন, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, নিরাপদ দর্শনপয়েন্ট এবং পরিকল্পিত আলোকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে খাপড়াভাঙ্গা নদী শুধু একটি ব্যস্ত মৎস্যবন্দরের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের উপকূলের অন্যতম আকর্ষণীয় সন্ধ্যাকালীন পর্যটন গন্তব্য।
