দুঃসময়ের কান্ডারির অপেক্ষায় গোটা দেশ
বিশেষ প্রতিনিধি
দীর্ঘ দেড় যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ। বাংলাদেশের ইতিহাসে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক এবং অনন্য। আজ দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু এজন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় যে তিনি এখন বিএনপির চালিকাশক্তি এবং প্রধান কার্যকর নেতা। তার দেড় যুগ পর স্বদেশে ফেরা শুধু এজন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষের জন্য তাঁর দেশে ফেরা এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বহুল প্রত্যাশিত একটি ঘটনা।
এমন এক সময় তিনি দেশে ফিরছেন যখন একটি গণ অভ্যুত্থানের পর একটি জাতি পথহারা। অনিশ্চয়তার মধ্যে গোটা দেশ। সাধারণ মানুষ অসহায়, উদ্বিগ্ন। অর্থনীতি গতিহীন। জনগণ বিভক্ত। মব সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি মানুষ। আইনের শাসন নির্বাসনে। যে আশায় বুক বেঁধে এ দেশের লাখো তরুণ রাজপথে নেমে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছিল সেই স্বপ্ন আজ বিবর্ণ। হতাশা বাড়ছে সর্বত্র। একজন যোগ্য কা ারির অভাব অনুভব করছে গোটা দেশ। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে চরম রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশের জনগণের অবিসংবাদিত নেতা বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। জাতিকে পথ দেখানোর অবস্থায় তিনি নেই। বাংলাদেশের এ সংকটকালে তার নির্দেশনা ও নেতৃত্বের অভাব গোটা জাতি উপলব্ধি করছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন এখন দেশে যে অনৈক্য, হানাহানি, মব সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, জনজীবনে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা- বেগম জিয়া সুস্থ থাকলে এমনটি হতো না। নিশ্চিতভাবেই তিনি জাতিকে পথ দেখাতেন।
এখন বাংলাদেশে নেতৃত্বের চরম সংকট। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা বাড়ছে। সবাই যেন দলের নেতা, একটি বিশেষ পক্ষের নেতা। এমন কোনো নেতা নেই যার কারণে জনগণ বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। ফলে, কেউ কারও কথা শুনছে না, যার যা খুশি তাই করেছে। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ কখনো এমন অভিভাবকহীন ছিল না। সুশীল সমাজের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে প্রতিনিয়ত। সুশীল সমাজকে এখন আর নিরপেক্ষ ভাবে না বেশির ভাগ মানুষ। সাধারণ মানুষ মনে করেন সুশীল সমাজ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সবকিছু করে।
এ অবস্থার অবসান ঘটাতে পারেন তারেক রহমান। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একজন কা ারি পাচ্ছে। একজন জাতীয় নেতার অভাব পূরণ হচ্ছে। তারেক রহমানকে নিয়ে এ আশাবাদের কারণও আছে। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এরকমই এক চরম সংকটে জাতির হাল ধরেছিলেন। ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ যখন নেতৃত্বহীন, দিশাহারা। দেশজুড়ে যখন অনিশ্চিয়তা আর অস্থিরতা, ঠিক তখনই জাতির প্রয়োজনে তিনি এগিয়ে এসেছিলেন। হাল ধরেছিলেন দিশাহারা জাতির। বিভক্ত, ক্ষতবিক্ষত দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। দেশের আপামর জনগণ তার ওপর আস্থা রেখেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশকে শান্ত ও স্বাভাবিক করেন। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।
জিয়ার মৃত্যুর পর আবার বাংলাদেশ পথ হারায়। আবারও শুরু হয় বিভক্তি, হানাহানি। স্বৈরশাসন চেপে বসে জনগণের ওপর। মানুষ হারায় তার মৌলিক অধিকার। বুটের নিচে পিষ্ট হয় সংবিধান। এরকম অবস্থায় গৃহবধূ থেকে রাজনীতির জটিল এবং কঠিন পথে পা বাড়ান বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতা। রাজনীতির জটিল কূটকৌশল তিনি বুঝতেন না কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন আন্দোলন। স্বৈরশাসককে হটাতে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কিন্তু নীতির প্রশ্নে এক চুলও ছাড় দেননি। লক্ষ্য স্থির করে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেছেন। বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন অকাতরে। এরকম জনন্দিত নেতা বাংলাদেশে শুধু নয় সারা বিশ্বেই বিরল।
বাংলাদেশ আজ এমনই এক সংকটে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট ’৭৫ কিংবা ’৮২ সালের চেয়েও গভীর। বাংলাদেশ এখন যেন মাঝ সমুদ্রে পথ হারানো এক জাহাজ। সমুদ্রে দুর্যোগের পূর্বাভাস। জাহাজের যাত্রীরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। এরকম এক গভীর সংকটে যেমন একজন যোগ্য, দূরদর্শী ক্যাপটেন দরকার। তারেক রহমানই সেই নেতা, পথপ্রদর্শক, যিনি জাতিকে নিয়ে যেতে পারেন কাক্সিক্ষত বন্দরে। বাবা ও মায়ের মতোই গোটা জাতিকে তিনি আবার ঐক্যবদ্ধ করবেন- এটা বিশ্বাস করেন দেশের বেশির ভাগ মানুষ।
তারেক রহমান দেশে ফেরার ফলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটবে। নির্বাচন কমিশন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। বিশেষ করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যাবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি উজ্জীবিত হবে। তারা বিএনপির পক্ষে জোয়ার সৃষ্টি করতে প্রাণপণ চেষ্টা করবে। এরফলে জামায়াতসহ অন্যান্য দলও তাদের নির্বাচনি প্রচারণা জোরদার করবে। দেশে একটি নির্বাচনি আবহ তৈরি হবে। দেশের বর্তমান সংকট নিরসনের প্রধান উপায় হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে দেশ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ। আর এজন্যই তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন গণতন্ত্রের উত্তরণের পথে এক মাইলফলক।
