দৃশ্যমান স্বপ্নের মুখোমুখি রিমি রুম্মান

রিমি রুম্মান

আমার দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হলে দুলাভাই বলল, তোমাকে এবার খুলনায় বেড়াতে নিয়ে যাব। খুলনার কথা শুনে আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে যাই। কেননা, আমার মেজো খালা বিয়ের পর থেকে সপরিবারে খুলনায় বসবাস করছেন স্থায়ীভাবে। আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে প্রতি বছর দাদা-বাড়ি, নানা-বাড়ি, ঢাকা, নয়ত খুলনায় খালার বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যেতেন আব্বা-আম্মা। সেইসব স্থানে দীর্ঘ একমাসের ছুটি কাটাতাম।

এখন যেমন আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে প্রতি বছর গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে নিউইয়র্কের বাইরে নয়ত অন্য কোনো দেশে নিয়ে যাই, হোটেলে রাত্রি যাপন করি, অনেকটা তেমন। আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের সন্তানদের প্রজন্মের শৈশব কৈশোরের যাপিত সময় অনেকটাই ভিন্ন। ওরা গাড়িতে চড়ে বাবা-মা’র সঙ্গে বেড়াতে যায় পথে পথে সার্ভিস সেন্টারে থেমে, খেয়ে, বিশ্রাম নিয়ে। অথচ আমরা দাদা-বাড়ি যেতাম রেলগাড়িতে চড়ে। কুউউ ঝিক ঝিক শব্দে মাইলের পর মাইল ফসলের ক্ষেত পেছনে ফেলে। নানা-বাড়ি যাতায়াতের সহজ মাধ্যম ছিল ছইওয়ালা নৌকা। তাতে চড়ে জলজ গাছ পেরিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যেতাম গন্তব্যে। ঢাকা কিংবা খুলনায় যেতাম লঞ্চে। সেই সময়ের লঞ্চগুলোতে এখনকার মতো এত আধুনিক সুযোগসুবিধা ছিল না। ২/১টি কেবিন উচ্চবিত্তের জন্যে বরাদ্দ থাকত। বাকি সকল যাত্রীরা লঞ্চের ভেতরের বিশাল মেঝেতে বিছানার চাদর বিছিয়ে যার যার মতো করে গুছিয়ে নিতেন। ব্যবহার্য জিনিসে ঠাঁসা সুটকেসের সাথে টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত, মাছ, মাংস কিংবা রুটি বহন করে নিতেন ভ্রমণকারীগণ। খুলনায় যেতে কত ঘণ্টা সময় লাগত আমার ঠিক স্মরণে নেই। শুধু স্মৃতির জানালায় ভেসে ওঠে একদিন ও একরাতের দীর্ঘ ভ্রমণের দৃশ্য। আমরা ঘুমাতাম, জেগে উঠতাম, দুপুরের ও রাতের খাবার খেতাম। বাতাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জলের শব্দ, ইঞ্জিনের বিকট আওয়াজ এখনও যেন কানে বাজে। শেষবার খুলনায় গিয়েছি এসএসসি পরীক্ষার পর।

ধীরে ধীরে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে। একবার আমার দুলাভাইয়ের খুলনায় পোস্টিং হয়েছিল। তিনি মাঝে মধ্যে বাসে ঢাকায় আসতেন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে। পারিবারিক এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একবার তিনি খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তখন সময়টা ছিল ২০০৪। রাতের অনুষ্ঠান একসময় শেষ হয়। আগত অতিথিরা বাড়ি ফিরে যেতে শুরু করে। ঠিক সেই সময়ে দুলাভাই ঢাকায় এসে পৌঁছায় দীর্ঘ বারো ঘণ্টা ভ্রমণ শেষ!
কিন্তু এবারের বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। এবার পদ্মা সেতু হয়েছে। সময় কম লাগবে। তাছাড়া পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে আমি খুলনায় যাব, আসব, বিষয়টি আমাকে যারপরনাই রোমাঞ্চিত করে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের সময়টায় নিউইয়র্কে বসে ‘সাপ্তাহিক বাঙ্গালী’র জন্যে লিখেছিলাম এক দীর্ঘ লেখা ‘স্বপ্ন যখন দৃশ্যমান’। পত্রিকার পাতায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, রেস্তোরাঁয় চায়ের টেবিলে আলোচনায় বিভিন্নজনের আবেগ-অনুভূতি উঠে এসেছে সেই লেখায়। দৃশ্যমান স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এই সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না।

নির্দিষ্ট দিনে সকাল সকাল ঢাকার বসুন্ধরা থেকে আপা, দুলাভাইর সঙ্গে রওয়ানা দেই খুলনার উদ্দেশ্যে। দিনটি ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। বাংলাদেশ নামের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিজয়ের ঐতিহাসিক দিন। এমন একটি দিনে আমি যখন শত সহস্র বাঁধা-বিপত্তি ও জটিলতা অতিক্রম করে নির্মিত হওয়া বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যাচ্ছিলাম, আমার ভেতরটা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছিল। আমি ডানে তাকাই। বাঁয়ে তাকাই। সামনে যতদূর চোখ যায়, দৃষ্টি প্রসারিত করি। ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। হাতের তালুতে চোখ মুছি।

বাংলাদেশ পরিপূর্ণভাবে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করেছে এই স্থাপনা! আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, পদ্মা সেতু! স্বপ্নের মতো ব্রিজটি পার হয়ে গেলাম। এরপর আমি যতই খুলনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, ছোট বড় আরও কিছু ব্রিজ পার হয়ে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে রইলাম। সড়কের দুই পাশে মাইলের পর মাইল দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ, আবাসন প্রক্রিয়ার সাইনবোর্ড, আর ফসলের ক্ষেত। যেমন দৃশ্য নিউইয়র্কের বাইরের কোনো রাজ্যের দিকে যেতে আমাদের নজরে পড়ে, ঠিক তেমন। পার্থক্য শুধু কিছু স্থানে ছবির মতো সুন্দর, পরিচ্ছন্ন বাড়িঘরের পরিবর্তে প্রান্তিক মানুষের কুঁড়েঘর, গোয়ালঘর। পথের দুইধারে প্রকাণ্ডসব বৃক্ষ। ছায়া-ঘেরা মায়া-ঘেরা পথটুকু পার হতে হতে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, পুরোটা পথের কোথাও কোনো ভাঙা বা গর্ত নেই। এ যেন আমি বিশ্বের উন্নত কোনো দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি। বিশ্বের যে কয়টি দেশ ভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে, আমি খুব সম্মানের সঙ্গে, বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের কেউ আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমরা জেনে এসেছি, যে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত, সেই দেশের অর্থনীতি তত সমৃদ্ধ।

সুতরাং আমরা আর পিছিয়ে নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ পদে পদে চরম সত্য হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বহুবার। আমাদের সত্যিই কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছ থেকে ১৯৭২ সালে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত হওয়া দেশটি তিল তিল করে পঞ্চাশ বছর পর আজকের এই অবস্থানে! কোথায় যেন পড়েছিলাম ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের আঠারো কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। ২০৩৫ সাল, সে তো খুব বেশি দূরে নয়!

আমরা যখন খুলনা থেকে ফিরছিলাম, আমাদের চালককে বলেছিলাম, পদ্মা সেতুর কাছাকাছি কোথাও গাড়ি থামাতে। দূর থেকে সেতুটি দেখার প্রবল এক বাসনা মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। বিধায় আমাদের আর দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে দেখা হয়নি। তবে রাত্রিকালীন পদ্মা সেতুর সৌন্দর্যও প্রাণভরে উপভোগ করলাম। বিষয়টি এখানেই আত্নতৃপ্তির সঙ্গে শেষ হতে পারত। কিন্তু নিউইয়র্কের বড় বড় সেতু দূর থেকে দেখতে কী অসাধারণই না লাগে! দূর থেকে সেতুর লাইটগুলো দেখে মনে হয় যেন আকাশের বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত তারা। এমন দৃশ্য আমার দেশেও আছে, অথচ আমি তা দেখব না! এই অতৃপ্তি নিয়ে আমাকে ফিরে আসতে হবে! আপা-দুলাভাইকে বলবো কিনা ইতস্তত করছিলাম। প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি সময় প্রবাসে থাকা আমার আবেগ-অনুভূতি তারা কতটুকুই বা বুঝবে! হয়ত ভেবে বসবে, কী আদিখ্যেতা রে! আমি আমার স্বামীর বড়বোনকে জানালাম মনোবাসনার কথা। সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল নিয়ে যেতে। সাথে মাওয়া-ঘাটে ইলিশও খাওয়া হবে। নিউইয়র্ক ফিরে আসার দিন দুয়েক আগে আবারও যাই পদ্মা পারে। রাতের আধো অন্ধকারে দূরে দাঁড়িয়ে আরেকবার মন ভরে দেখে নেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের বুকে তখন উজ্জ্বল তারার মতো মিটিমিটি করে জ্বলছে সেতুর অসংখ্য বাতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights