দেশকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায় সরকার
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এই সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয়, বরং এই মেলা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার হয়ে উঠুক। গতকাল বিকালে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটি সমৃদ্ধ, মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে বইমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। অনুষ্ঠানে সুরসপ্তকের শিল্পীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমসহ কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার মেলা নয়, এটি আমাদের মেধা ও মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষাশহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আজকের এই মেলা। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’

এবারের মেলা নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে শুরু হওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও বইমেলার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। এটি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী স্মারক।’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন। জার্মান দার্শনিক মার্কুইস সিসেরোর উক্তি উদ্ধৃত করে তারেক রহমান বলেন, বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো। বিজ্ঞানীদের মতে, বই পড়া মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। অথচ বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বইবিমুখ করে তুলছে। স্ক্রিনে পড়ার চেয়ে কাগজের পাতায় কালো অক্ষরে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করার আবেদন অনন্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘১০২টি দেশের পাঠাভ্যাস জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। আমাদের নাগরিকেরা বছরে গড়ে মাত্র তিনটি বই পড়েন। এই চিত্র আমাদের পাল্টাতে হবে। মেলা যেন শুধু উৎসব না হয়ে আমাদের বইপ্রেমী করে তোলে, এটাই প্রত্যাশা।’ বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দলমত-ধর্মবর্ণনির্বিশেষে একটি নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন। এরপর তিনি ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিক বইমেলার উদ্বোধন করেন এবং বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে পদকপ্রাপ্তদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন -পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘একুশে পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে পদকপ্রাপ্তদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন -পিআইডি
৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যান্ড দলকে একুশে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অমর একুশে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গতকাল ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি সংগীত ব্যান্ড দলকে ‘একুশে পদক ২০২৬’ প্রদান করেছেন। গতকাল সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে যথাযোগ্য মর্যাদায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পদকপ্রাপ্তদের হাতে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ তুলে দেন। সচিবালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে পদক বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে জাইমা রহমান। বেলা পৌনে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন থেকে ৫ নম্বর ফটক দিয়ে বেরিয়ে পরিবহন পুল ভবনের সামনে দিয়ে ওসমানী মিলনায়তনে যান। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ের মূল ফটক দিয়ে আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আসেন তিনি।
পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি- শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে রাজনীতিকরণ করা কখনোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় যাতে দেশ এগিয়ে যেতে পারে, নৈতিক মানসম্পন্ন তেমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অবশ্যই কাজ করবে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন। এটি শুধু একটি পদকই নয়; বরং এই পদকের মধ্য দিয়ে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে স্মরণে আনার পাশাপাশি যেসব বিজ্ঞজন শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, গবেষণা ও চর্চায় নিজেদের এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের পরিচয় ঘটে।’
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ও গুণগত অবদান পাঠ করে শোনান এবং পদক প্রদান পর্ব পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে। সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটের দিকে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। সচিবালয় থেকে হেঁটে একুশে পদকের অনুষ্ঠানে আসা-যাওয়া করেন প্রধানমন্ত্রী, সঙ্গে ছিলেন- মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন- চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ফরিদা আক্তার ববিতা, চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাশ্যুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ। এ ছাড়া জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’ সংগীত দল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে। মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্ত আইয়ুব বাচ্চুর পক্ষে তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আখতার চন্দনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। আর ওয়ারফেজের পক্ষে দলনেতা শেখ মনিরুল আলম পুরস্কার নেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিলেন যাঁরা : প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ গ্রহণ করেছেন আট বিশিষ্টজন। গতকাল অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ/গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় যৌথভাবে মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ও মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসান। তবে বাংলা একাডেমি এবার সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৯ জনকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল। গতকাল পুরস্কার প্রদানের সময় কবিতার জন্য মনোনীত কবি মোহন রায়হানের নাম ডাকা হয়নি।
