নথির পাতায় ইতিহাস, স্মৃতির ভেতর বাংলাদেশঃ প্রশ্ন, পথচলা ও এক স্বপ্নের কথা
কিছু প্রশ্ন, কিছু স্মৃতি এবং আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ
আমার বাবার কথা দিয়ে শুরু করি। মুকাররম হোসেন—বাংলাদেশ পুলিশের একজন নিবেদিতপ্রাণ, মেধাবী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হওয়ার সময় আমার বাবা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (CMP) ডিএসপি এবং ডিটেকটিভ শাখার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তার দায়িত্বের সঙ্গেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। আমার বাবা অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিয়ে কিছু আশঙ্কা অনুভব করেছিলেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। শুধু মৌখিকভাবে নয়—বিভিন্ন GD Entry-এর মাধ্যমে লিখিতভাবেও তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর সেই সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল? আজও এই প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। আর এই হত্যাকাণ্ডের পর আমার বাবা যে FIR দাখিল করেছিলেন, তার সঙ্গে ছিল ৫৭ পৃষ্ঠার বিস্তারিত নথি ও supporting documents।
সেই ৫৭ পৃষ্ঠায় কী ছিল?
আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই— সেই ৫৭ পৃষ্ঠায় কী লিখেছিলেন আমার বাবা? তিনি কী তথ্য দিয়েছিলেন? কী কী ঘটনা তিনি নথিভুক্ত করেছিলেন? হত্যাকাণ্ডের আগে তাঁর করা বিভিন্ন GD Entry-তে কী ছিল? কারা কীভাবে নড়াচড়া করেছিল? তিনি কী আশঙ্কা করেছিলেন? কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু আমার পরিবারের জন্য নয়—বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, সেই ৫৭ পৃষ্ঠার নথি যদি সত্যিই সংরক্ষিত থাকে, তাহলে তা গবেষক, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সামনে আসা উচিত। কারণ ইতিহাস শুধু ক্ষমতাবানদের লেখা গল্প নয়। ইতিহাসের সত্য খুঁজে পাওয়া যায় নথিতে, সাক্ষ্যে, স্মৃতিতে এবং কখনো কখনো একজন সৎ কর্মকর্তার সাহসী সিদ্ধান্তে।
৪৫ বছর পর কেন?
আজ প্রায় ৪৫ বছর পর যখন সেই নথির কথা আবার সামনে এসেছে, তখন আমার মনে আরও কিছু প্রশ্ন জেগেছে। এতদিন কোথায় ছিল সেই কাগজগুলো? গত ৪৫ বছরে কেন এগুলো সামনে এলো না? কেন এতদিন কেউ এই নথির বিষয়ে জনসমক্ষে প্রশ্ন তুলল না? আজ যখন The Daily Star সেই পুরোনো নথির কথা প্রকাশ করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে। আমার মনেও জেগেছে। আমি জানতে চাই— কেন এখন? কেন এতদিন পরে? কী কারণে এত দীর্ঘ সময় ধরে এই নথি মানুষের অগোচরে রইল? আরও অনেক প্রশ্ন আছে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষও এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চায়।
আমার বাবার অবস্থান
আমার বাবার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে FIR প্রত্যাহার করার জন্য অথবা তার বক্তব্য পরিবর্তন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি তাঁর ৫৭ পৃষ্ঠার FIR পরিবর্তন করেননি। প্রত্যাহারও করেননি। তিনি তাঁর দায়িত্ব এবং নিজের বিবেকের জায়গায় অটল ছিলেন। এর ফল তাঁকে ভোগ করতে হয়েছিল—এমনটাই তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন। তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেওয়া হয়েছিল। অবসর গ্রহণের পরও তিনি তাঁর পেনশন ও অবসরকালীন প্রাপ্য সুবিধা পাননি—এমন অভিযোগও তিনি আমাকে করেছিলেন। আমি জানি না, আজকের সরকারি নথিতে তাঁর জীবনের এই অধ্যায়ের সবকিছু কীভাবে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু একজন ছেলে হিসেবে আমি জানি—আমার বাবা নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরে যাননি।
আমার আরও কিছু প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে বহু প্রশ্ন রয়েছে। আমার বিশ্বাস ও বাবার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমি মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির ভূমিকা ছিল। আমি জেনারেল এরশাদ, ভারতের RAW এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছি। তবে আমার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যেন নিরপেক্ষ তদন্ত, দলিল এবং প্রমাণের মাধ্যমে পাওয়া যায়। আমি কাউকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দোষী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমি চাই সত্য সামনে আসুক। ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হোক। “জিয়াউর রহমানের জন্য ন্যায়বিচার চাই। খালেদা জিয়ার জন্য ন্যায়বিচার চাই।” আমার বিশ্বাস, ইতিহাসের কিছু অধ্যায় এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শিখেছে
বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু দেখেছে। অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখেছে। অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে। অনেক অন্যায় ও অবিচার সহ্য করেছে। তাই আজ মানুষ প্রশ্ন করতে শিখেছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষের সামনে ইতিহাসের সব গুরুত্বপূর্ণ নথি উন্মুক্ত করা উচিত। সত্য যত কঠিনই হোক, মানুষকে সত্য জানার সুযোগ দিতে হবে। কারণ কোনো জাতি তার ইতিহাসকে অন্ধকারে রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।
১৯৭১ নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন
আমার চিন্তার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ১৯৭১ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। আমাদের মানুষ প্রাণ দিয়েছে। আমরা আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্র চেয়েছি। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করেছি। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি, ভারত ও পাকিস্তানের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আমার নিজের কিছু প্রশ্ন ও উপলব্ধি রয়েছে। আমি বিভিন্ন সময় এসব বিষয়ে কথা বলেছি, লিখেছি এবং মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি মনে করি, আমাদের ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে অধ্যয়ন করা দরকার। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে দলিল, নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি এবং গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে বোঝা উচিত।
আমাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে
আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়ানো। আমরা বড় দেশগুলোর দিকে তাকাই। তাদের শক্তি ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হয়। আমাদের জাতীয় স্বার্থকে আমাদের নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকা ভালো। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা আরও ভালো। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ কখনো নিজের স্বাধীনতা বা আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেওয়া নয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বৃহত্তর বাংলার স্বপ্ন
বাংলা আমার মাতৃভূমি। বাংলা আমার মাতৃভাষা। বাংলার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আমার অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমান বাংলাদেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক ঐক্য আমাকে দীর্ঘদিন ধরে ভাবিয়েছে। আমি একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলার স্বপ্ন দেখি। আমার কাছে এই স্বপ্ন কোনো মানুষের বিরুদ্ধে নয়। এটি আমার শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা। আমার ইতিহাসের প্রতি টান। আমার ভাষার প্রতি ভালোবাসা। আমি নিজেকে গর্বের সঙ্গে একজন বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিই। বাংলাদেশ আমার দেশ। বাংলা আমার ভাষা। আর বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমার হৃদয়ের অংশ।
১৯৭২ থেকেই আমার পথচলা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সাল থেকেই কয়েকজন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমি বৃহত্তর বাংলা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্য নিয়ে ভাবতে শুরু করি। তখন আমি ছিলাম খুবই তরুণ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সেই বয়সেই আমি ‘Campus’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করি। আমি ছিলাম তার সম্পাদক, প্রকাশক ও মালিক। পরে প্রতিষ্ঠা করি সাপ্তাহিক ‘দেশ বিচিত্রা’। সংবাদ ও মতামতের মাধ্যমে আমি আমার চিন্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি। আমার এই যাত্রা থামেনি; আজও সেটা চলমান।
এক জাতি, এক ভাষা, এক ঐতিহ্য
আমার চিন্তার মূল জায়গা ছিল—এক জাতি, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি এবং এক ঐতিহ্যের বন্ধন। এই ভাবনাই আমার নিজের পরিচয় গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলার বিভিন্ন অংশে আমার অনেক বন্ধু রয়েছেন, যারা আমার এই সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভাবনাকে ভালোবাসেন। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের এক করে। রাষ্ট্রের সীমানা থাকতেই পারে। কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনকে কোনো সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না।
জার্মানি আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে
পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একসময় বিভক্ত ছিল। পরে তারা আবার একত্রিত হয়েছে। একটি জাতি তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বন্ধনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। সেই উদাহরণ আমাকে ভাবিয়েছে—বাঙালির ক্ষেত্রেও কি সাংস্কৃতিক ঐক্যের নতুন কোনো পথ তৈরি হতে পারে না? আমি জানি, ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। তবু স্বপ্ন দেখার অধিকার মানুষের আছে। আমার স্বপ্ন হলো—বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে আরও গভীর সাংস্কৃতিক, মানবিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন তৈরি হোক।
পৃথিবীর ভাষা শিখে নিজের ভাষার কাছে
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি জার্মান ভাষা শেখার চেষ্টা করেছি। এছাড়া জাপানি, ফরাসি, আরবি, উর্দু, হিন্দি ও পশতু ভাষার সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, অন্যের ভাষা শেখা মানে নিজের ভাষাকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং অন্যের ভাষা ও সংস্কৃতি জানলে নিজের শিকড়কে আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। আমার মাতৃভাষা বাংলা। আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আমি একজন বাংলাদেশি—এই পরিচয় আমার কাছে গর্বের।
পৃথিবীর মানুষের কাছে বাংলাদেশের কথা
জীবনের বিভিন্ন সময়ে আমি ২৮টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছি। আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, মানবিকতা এবং শান্তির বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করেছি। আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ করতে হলে মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ধর্মের মধ্যে সংলাপ দরকার। সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগ দরকার। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
৯/১১-এর পর আমার অবস্থান
৯/১১-এর ভয়াবহ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেই ভাষণের পর আমি বিশ্ববাসীর প্রতি শান্তি ও ঐক্যের আহ্বান জানাই। আমি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় মানুষের ঐক্যের কথা বলি। আমার বক্তব্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ও সম্প্রচারিত হয়েছিল—এটি আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। আমি তখনও বলেছিলাম—আমি বাংলাদেশের পক্ষে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পক্ষে। আমি পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষের পক্ষে। আমার কাছে মানুষের জীবন ও শান্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের দেশ হিসেবে দেখতে চাইনি
আমি সবসময় চেয়েছি বাংলাদেশকে একটি শান্তিপ্রিয়, মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে। আমি চাইনি বাংলাদেশকে কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে দেখা হোক। বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আমাদের সমাজের মূল শক্তি মানবিকতা ও সহাবস্থান। এই বিশ্বাস থেকেই আমি বিভিন্ন সময়ে শান্তির পক্ষে পাঁচটি বড় সভা ও সেমিনারের আয়োজন করেছি। আমার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা, অখণ্ডতা এবং শান্তির কোনো বিকল্প নেই।
দেশ ছাড়ার সেই দিন
আমার বাংলাদেশে বড় ব্যবসা ছিল। ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ছিল। চারটি লাভজনক এবং চারটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানও ছিল আমার। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর আমার অভিজ্ঞতা খুব কঠিন হয়ে ওঠে। আমার বিশ্বাস, তখনকার সরকার এবং ভারতের প্রভাবের কারণে আমার প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আমি আমার পরিবারকে নিয়ে মাত্র একটি ব্যাগ হাতে দেশ ছাড়ি। পেছনে পড়ে রইল আমার ব্যবসা; আমার প্রতিষ্ঠান। আমার বহু বছরের পরিশ্রম আর আমার স্মৃতি। কিন্তু আমি আমার বিশ্বাসকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটি কেউ কেড়ে নিতে পারেনি।
কফি আনানের সঙ্গে সাক্ষাৎ
জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান আমার কাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং আমাকে তাঁর দপ্তরে নাশতার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরও বেশি সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আমার প্রস্তাব তুলে ধরেছিলাম। আমার কথা তিনি গুরুত্ব দিয়ে শুনেছিলেন—এটাই আমার স্মৃতি। সেই সাক্ষাৎ আমার জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সফর
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, আমি সেই সফরের সঙ্গে co-host হিসেবে যুক্ত ছিলাম। সেই সময়ের কিছু ঘটনা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সফরকে ঘিরে বাংলাদেশকে নিয়ে কিছু নেতিবাচক ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। আমি তার বিরোধিতা করেছি। আমি চাইনি বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হোক। আমি আমার উদ্বেগ প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছেও জানিয়েছিলাম। আমার অবস্থান ছিল পরিষ্কার—বাংলাদেশকে ভালোবাসা মানে বাংলাদেশের ভুলকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়। বরং দেশের সুনাম, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্য কথা বলাও দেশপ্রেমের অংশ।
৯/১১-এর পর শেরাটনের সেই দিন
৯/১১-এর পর আমি ঢাকার শেরাটন হোটেলে একটি বড় শান্তি ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মসূচি চলেছিল। মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমি নিজে সভাগুলোর সভাপতিত্ব করি। মঞ্চে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন ক্রিস্টোফার ওয়েবস্টার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, জাতিসংঘের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কার্যরত বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানির কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সংবাদপত্রে ব্যাপক প্রচার হয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি, সেই আয়োজন বাংলাদেশের একটি শান্তিপ্রিয় ও সহনশীল চিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে সাহায্য করেছিল।
ভালোবাসার জায়গা থেকে আমার অবস্থান
আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। আমি বাংলাকে ভালোবাসি। আমি যুক্তরাষ্ট্রকেও ভালোবাসি। কিন্তু কোনো সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য আমার নীতি নয়। ক্ষমতায় কে আছে—সেটি আমার কাছে মুখ্য নয়। আমার কাছে মুখ্য হলো—মানুষ, দেশ, শান্তি, স্বাধীনতা ও মানবিকতা।
যে সম্মানগুলো পেয়েছি
আমার মানবিক ও সামাজিক কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেট, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেট এবং অ্যাসেম্বলির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছি। আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদক দেওয়া হয়েছে। Washington DC এবং New York State-এ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছি। ‘Key to the City’-এর মতো সম্মানও আমার জীবনের স্মরণীয় অর্জন। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের নামে Gold Medal পাওয়ার সম্মানও পেয়েছি। এসব সম্মান আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এগুলো আমাকে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জন্য করা কাজের মূল্য আছে।
ধর্মের আগে মানুষ
আমি একজন মুসলমান। ইসলাম আমার ধর্ম। কিন্তু আমি নিজেকে শুধু ‘মুসলমান’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখতে চাই না। প্রথমে আমি একজন মানুষ। শৈশব থেকেই আমি বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষা জানার চেষ্টা করেছি। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মের মূল শিক্ষা পড়েছি। প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই আমি ভালোবাসা, ন্যায়, মানবিকতা, আত্মসংযম এবং শান্তির শিক্ষা খুঁজে পেয়েছি। আমি এখনও এসব ধর্মের শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করি। আমার বিশ্বাস—মানুষকে ভালোবাসা, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং শান্তির পক্ষে দাঁড়ানোই মানবতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমার শেষ কথা
জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমি দেখেছি রাজনীতি। দেখেছি ক্ষমতার পরিবর্তন। দেখেছি মানুষের উত্থান-পতন। দেখেছি অন্যায়। দেখেছি মানুষের অসহায়ত্ব। আবার দেখেছি মানুষের ভালোবাসা, সাহস ও অসাধারণ মানবিকতা। আমার কাছে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। আমাদের ইতিহাসের অনেক পৃষ্ঠা এখনও অন্ধকারে। অনেক নথি এখনও মানুষের সামনে আসেনি। অনেক সত্য এখনও অনুসন্ধানের অপেক্ষায়। কিন্তু আমি হতাশ নই। আমি বিশ্বাস করি, সত্যের নিজস্ব একটি শক্তি আছে। একদিন না একদিন সত্য নিজের পথ খুঁজে নেয়। আমি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ইতিহাস জানুক। তারা নিজেদের শিকড় চিনুক। তারা মাথা উঁচু করে বলুক— আমি বাংলাদেশি। আমি বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। আমি মানুষকে ভালোবাসি। আমি শান্তিকে ভালোবাসি। আমি এই পৃথিবীকে ভালোবাসি। আমার স্বপ্ন বিভাজনের নয়—ঐক্যের। আমার স্বপ্ন ঘৃণার নয়—মানবতার। আমার স্বপ্ন সংঘাতের নয়—শান্তির। আর আমার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা—আমার বাংলাদেশ স্বাধীন, সার্বভৌম, মর্যাদাশীল, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।
