নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, কুয়েটে পাঁচ শিক্ষকসহ ৭ জন চাকুরিচ্যুত
অনলাইন ডেস্ক
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) শৃঙ্খলাভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচ শিক্ষক, একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিয়োগের সময় বয়সসংক্রান্ত অনিয়ম, অভিজ্ঞতার সনদে অসংগতি, গবেষণাপত্রের অস্তিত্ব না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুত সাতজনই দীর্ঘদিন ধরে সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। একসঙ্গে সাতজন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি হারানোর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম) বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র, ইএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফা এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান। এ ছাড়া চাকরিচ্যুত হয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত থাকাকালে তিনি নিয়মিত ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর নাম পাওয়া যায়, যদিও এ বিষয়ে কুয়েটের অনুমতি ছিল না বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর কুয়েটে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী, প্রভাষক পদে আবেদনের ক্ষেত্রে বয়স ৩০ বছরের বেশি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তাঁর আবেদনের সময় বয়স ৩০ বছরের বেশি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফার বিরুদ্ধেও নিয়োগসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। প্রভাষক পদে আবেদনের সময় তাঁর বয়স ৩০ বছরের বেশি ছিল। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির অভিজ্ঞতা গণনায় নেওয়া হয়েছিল, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমানের বিরুদ্ধে নিয়োগের যোগ্যতা ও গবেষণাপত্র নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও তিনি দুটি ডিগ্রিতেই দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি নিয়োগ পান বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনের সময় তাঁর নামে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রের উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডলের বিরুদ্ধেও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিলেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানা গেছে। সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিদেশে গেলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের সময় মিথ্যা ও বানোয়াট অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কম দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও শিক্ষক নিবিড় মণ্ডল হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে কুয়েটের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁরা রিট করেননি। বরং ছয় মাসের বেশি সময় কাউকে সাময়িক বরখাস্ত রাখা যায় কি না, সে বিষয়েই তাঁরা রিট করেছিলেন বলে জানিয়েছে কার্যালয়টি।
কুয়েটের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভূঞা গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাতজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অভিযোগ থাকায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তদন্তের পর অনেকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়; কেউ ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ দেননি। সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচ শিক্ষক, একজন কর্মকর্তা ও একজন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
