নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপাদান দেখা যায়নি
নিজস্ব প্রতিবেদক
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘এ নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো উপাদান দেখা যায়নি। টিআইবির দৃষ্টিতে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে।’
গতকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ কার্যালয় মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করে টিআইবি। এ সময় জানানো হয়, নির্বাচনে জয়ীদের মধ্যে ২৩৬ জন কোটিপতি এবং ১৩ জন শত কোটিপতি রয়েছেন। বিজয়ী প্রার্থীদের গড় বয়স ৫৯ বছর।
এবার এমপিদের বয়সভিত্তিক হার হলো : ২৫-৩৪ বছর বয়সি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ৩৫-৪৪ বছর বয়সি ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ৪৫-৫৪ বছর বয়সি ১৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, ৫৫-৬৪ বছর বয়সি ৩৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এবার প্রথমবারের মতো এমপি হয়েছেন ২০৯ জন। সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। আর নির্বাচনে প্রচার ব্যয়ের সীমা অনলাইন ও অফলাইন একক এবং যৌথভাবে ব্যাপক লঙ্ঘিত হয়েছে। শীর্ষ দুই দল বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। অফলাইন বা প্রত্যক্ষ প্রচার ব্যয় লঙ্ঘিত হয়েছে। নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ থেকে প্রায় ৩২৮ শতাংশ। শীর্ষে বিএনপি (৩২৭ দশমিক ৫ শতাংশ), স্বতন্ত্র (৩১৫ দশমিক ২ শতাংশ) জামায়াত (১৫৯ দশমিক ১ শতাংশ), জাতীয় পার্টি (১২৮ দশমিক ৬ শতাংশ), এনসিপি (১৯ দশমিক শূন্য শতাংশ)। এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ছিল। তাই ফ্যাক্টের ওপর ভিত্তি করেই বলা হয়েছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে নির্বাচনের সামগ্রিক বিষয় জানাতে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন বেছে নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করে টিআইবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই ৫৮টি আচরণবিধির কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনের দিনেও কেন্দ্রগুলোয় স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, কিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া, বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা করা, একজনের ভোট অন্যজন প্রদান, ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি। টিআইবি বলছে, ওই ৭০ আসনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি, বাড়িঘর, অফিসে হামলা হয়েছে ১৮টি, একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। সংস্থাটির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদের অর্ধেক সদস্যেরই দায় বা ঋণ রয়েছে। সদস্যদের মোট দায় বা ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা; যা বিগত চার সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। দলগতভাবে বিএনপিতে এই হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ। এবারের সংসদেও ব্যবসায়ী পেশার প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি- প্রায় ৬০ শতাংশ, যদিও দ্বাদশ সংসদের তুলনায় ত্রয়োদশ সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ৫ শতাংশ কমেছে। আবার নবম সংসদের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয় ছিল। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও পরিপন্থি আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধি মান্য করার অঙ্গীকার করলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। প্রার্থীরা তাদের নির্ধারিত খরচের সীমা অতিক্রমের চর্চা অব্যাহত রেখেছে। শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছে। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ; যা ২০০৮ সালের নবম সংসদের অর্ধেক এবং সবচেয়ে কম।
