নীল শয়তান থেকে সবুজ সম্ভাবনা
শামীম আহমেদ
কচুরিপানা অচল করছে নৌপথ, ভরাট হচ্ছে জলাশয়। এতে কর্ম হারাচ্ছে মৎস্যজীবীরা। ১৯৩৬ সালে এ ভূখণ্ডে কচুরিপানা নিধনে আইন হয়। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে কচুরিপানা দিয়ে তৈরি ব্যাগ, ঝুড়ি, ট্রে, শোপিস, পাপোশ, টুপি, টব ও ফুলদানি যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে। সরকারি উদ্যোগে কচুরিপানা হতে পারে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। সৃষ্টি করতে পারে বিপুল কর্মসংস্থান
নয়নাভিরাম বেগুনি ফুলে মোহ ছড়ালেও কচুরিপানা আজ দেশের পানি ও পরিবেশের জন্য এক ভয়ংকর শত্রু। নৌপথ অচল, নদীখাল ভরাট, মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া-সব মিলিয়ে আগ্রাসি এই জলজ উদ্ভিদটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে জাতীয় সমস্যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকলে এই ‘নীল শয়তান’ই হয়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব সম্পদ ও কর্মসংস্থানের বড় উৎস।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় অন্তত ৫৮টি নদী ও খাল এখন কচুরিপানার চাদরে ঢাকা। ডুমুরিয়া সদর, গুটুদিয়া, ধামালিয়া ও রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সহস্রাধিক মানুষ এসব জলাশয়ে মাছ শিকার করে জীবিকানির্বাহ করতেন। দিন-রাত হুইসল দিয়ে চলত নানান জলযান। কিন্তু কচুরিপানার দাপটে এখন নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, জাল ফেলার জায়গা নেই। এতে মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলো পড়েছে চরম দুর্ভোগে। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নদী-খালগুলো একাধিকবার পরিষ্কারের চেষ্টা হলেও অল্প সময়েই আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে জলাশয়গুলো। ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীসহ আশপাশের অধিকাংশ খালবিলেও কচুরিপানার উপস্থিতি বাড়ছে। ঢাকার অনেক খাল ও জলাশয় কচুরিপানার দখলে। এতে খালগুলো ভরাট হচ্ছে। সেই সুযোগে স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে তুলছেন। বগুড়া, সিলেট, রাজশাহী ও রংপুর থেকেও একই চিত্রের খবর মিলছে। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ গিয়ে সেখানকার সব খাল-জলাশয়ে কচুরিপানার আধিপত্য দেখা গেছে। অনেক স্থানে কচুরিপানা এতটা ঘন হয়েছে যে, তার ওপর দিয়ে হেঁটে ছোট বাচ্চারা ছোটখাটো খাল পার হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কচুরিপানা বিশ্বের অন্যতম আগ্রাসি জলজ উদ্ভিদ। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহে এটি দ্বিগুণ হতে পারে। অনুকূল পরিবেশ না পেলে এর বীজ ৩০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থেকেও অঙ্কুরিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। পানির ওপর ঘন আস্তরণ তৈরি করে কচুরিপানা পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যা জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে তলদেশে পলি জমা দ্রুত বাড়ে, এতে নদী ও খাল ভরাটের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।
বাংলায় কচুরিপানার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস শত বছরের বেশি পুরোনো। ১৮ শতকের শেষদিকে ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এক ব্যবসায়ী কচুরিপানা এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। ১৯১৪ সালের মধ্যেই এটি খালবিল, নদীনালা দখল করে নেয়। নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিলে ১৯১৮ সালে তৎকালীন সরকার কচুরিপানা নির্মূলের নির্দেশ দেয়। ১৯৩৬ সালে জারি হয় কচুরিপানা আইন। এমনকি ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল ইশতেহারে বাংলাকে কচুরিপানামুক্ত করার অঙ্গীকার করে। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আগ্রাসি উদ্ভিদের বিরুদ্ধে কবিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এখন আর রাজনৈতিক ইশতেহারে নেই কচুরিপানা নিধনের বিষয়। নেই কচুরিপানা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা। গুরুত্ব পাচ্ছে না পরিবেশ রক্ষার বিষয়ও।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কচুরিপানা বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। কেনিয়ায় করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির হ্রদগুলোতে কচুরিপানার কারণে বছরে ১৫ থেকে ৩৫ কোটি ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হয়। তবে সেই দেশেই কচুরিপানাকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকটি স্টার্টআপ। শুকনো কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিট ও বিভিন্ন ব্যবহারযোগ্য পণ্য।
বাংলাদেশেও এরই মধ্যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে শুরু করেছে। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যাগ, ঝুড়ি, ট্রে, শোপিস, পাপোশ, টুপি, টব ও ফুলদানি। এসব পরিবেশবান্ধব পণ্য ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামে কচুরিপানা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এখন অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস।
আরও বড় সম্ভাবনা দেখাচ্ছে গবেষণা খাতে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির একদল তরুণ গবেষক কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ তৈরি করেছেন। এই ব্যাগ ছয় মাসে মাটিতে পচে সার হয়ে যায়। পাশাপাশি কৃষিবিদরা বলছেন, কচুরিপানা থেকে উন্নতমানের জৈব সার তৈরি সম্ভব এবং ভাসমান বেডে ফসল উৎপাদনেও এটি কার্যকর। সরকার নিষিদ্ধ পলিথিন বন্ধ করতে অভিযান অব্যাহত রাখলেও কচুরিপানা দিয়ে বিকল্প পলিথিন তৈরির উদ্যোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কচুরিপানাকে শুধু পরিষ্কার অভিযান দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নীতি, গবেষণা সহায়তা, উদ্যোক্তা তৈরি ও বাজারজাতকরণে পৃষ্ঠপোষকতা। তবেই পানি ও পরিবেশের শত্রু কচুরিপানা রূপ নিতে পারে সবুজ সম্ভাবনায়, যা একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে তৈরি করবে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ। তারা বলছেন, যেহেতু কচুরিপানা কোনো যত্ন ছাড়াই দ্রুত বাড়ে এবং কচুরিপানা দিয়ে উন্নতমানের জৈব সার, পরিবেশবান্ধব পচনশীল প্লাস্টিক ব্যাগ, টুপি, ঝুড়ি, শোপিস, পাপোশ, ঝুড়ি, গাছের টব, আয়নার ফ্রেমসহ নানা বাহারি ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা যায়। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিদেশে এটার কদর প্রচুর। সঠিক পরিকল্পনায় পরিবেশের শত্রু কচুরিপানাই পরিণত হবে সম্পদে। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে বড় অবদান রাখবে। বাঁচবে নদী-খাল-জলাশয়। টিকে থাকবেন মৎস্যজীবীরা।
