পণ্যের বিনিময়ে দেশে ঢুকছে আইস-ইয়াবা, সীমান্তে ‘নার্কো-কারেন্সি’র বিস্তার
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশে যখন মাদক সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, ঠিক তখনই সামনে এলো দেশের সীমান্তে দিয়ে মাদক আসার নতুন কৌশলের চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এখন আর শুধু নগদ অর্থের লেনদেনেই বাংলাদেশে মাদক আসে না, এর পাশাপাশি পণ্যের বিনিময়ে মাদক লেনদেন হচ্ছে। এই পদ্ধতিকে ‘নার্কো-কারেন্সি’ বা মাদকভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে ইয়াবা ও আইসের চালান প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্ত। তবে বাংলাদেশে মাদক উৎপাদন না হওয়ায় এর প্রায় পুরো সরবরাহই সীমান্তপথে পাচার হয়ে আসে। এ অবস্থায় পাচারের রুট, কৌশল এবং বিস্তার নিয়ে যে নতুন তথ্য সামনে এসেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি চোরাচালানকারীরা মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে তৈরি পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব লেনদেনে নগদ অর্থের পরিবর্তে মাদকও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সূত্রগুলোর দাবি, রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে পাঠানো পণ্যের আংশিক মূল্য ইয়াবা ও আইস দিয়ে পরিশোধ করছে। এই লেনদেন মূলত বঙ্গোপসাগরের নৌপথে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে মাছ ধরার ট্রলারে করে চাল, ডাল, সিমেন্ট, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য মিয়ানমারে নেওয়া হয়। ফেরার সময় একই নৌপথ ব্যবহার করে দেশে আনা হয় মাদকের চালান। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই বিনিময়ভিত্তিক পাচার পদ্ধতি সীমান্তে মাদক নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মিয়ানমার সীমান্তে মাদক চালানের চিত্র
মাদক পাচারের অন্যতম রুট শুরু হয় মিয়ানমারের রাখাইনের আইয়িক সিট জেটি থেকে। টেকনাফ থেকে নৌপথে এর দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। সেখান থেকে ট্রলারে করে মাদক বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আনা হয়। এছাড়া ইয়াঙ্গুন থেকে মিনবিয়া, আন, সিতওয়ে, রাথিডাং ও মংডু হয়ে আরেকটি স্থল ও নৌপথও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, মাঝসমুদ্রে মাদক হস্তান্তরের আগে মিয়ানমারের পাচারকারীরা স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে এসব চালান দেশে প্রবেশ করে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোমেন মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে এবং বিনিময়ে দেশে ইয়াবা ঢুকছে। মাছ ধরার ট্রলারে করে পণ্য পাঠানো হয় এবং ফেরার সময় একই নৌকায় ইয়াবা আনা হয়। আগে মূলত হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হলেও এখন পণ্য পাঠিয়ে সরাসরি মাদক আনার প্রবণতা বেড়েছে। এ ধরনের কারবারে কিছু রোহিঙ্গা ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র জড়িত।
সীমান্ত দিয়ে কিভাবে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে- তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলের ভাষ্যে উঠে এসেছে। ওই জেলে মাদক কারবারে জড়িত দাবি করে এক মাঝির বিষয়ে গণমাধ্যমকে কথা বলেছেন। তার দাবি, ‘গত এক বছর ধরে এই কারবারের সঙ্গে জড়িত তারই সহকর্মী এক মাঝি। যে ব্যক্তি চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মধ্যে মাছের ট্রলার দিয়ে মাসে অন্তত তিনবার বাংলাদেশ থেকে চাল, ডাল, তেল ও সিমেন্ট পাঠাতেন এবং ফেরার পথে ইয়াবা নিয়ে আসতেন। চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রতিটি রাউন্ড ট্রিপে প্রায় পাঁচ দিন সময় লাগতো। হেড মাঝিকে দেওয়া হতো ৩ লাখ টাকা আর অন্য ক্রু সদস্যরা পেতেন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।’
ওই জেলে আরও দাবি করেন, ট্রলারের ওপরের ভাগে মাছ ও জাল রেখে নিচে গোপনে নিত্যপণ্য রাখা হতো। আর ফেরার সময় মিয়ানমার থেকে আনা মাছের পেটে ও ভেতরে ইয়াবা লুকিয়ে রাখা হতো।
যদিও সেই মাঝি এই কারবারে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তিনি নৌকাটি ভাড়া দিয়েছিলেন। যে ভাড়া নিয়েছিল, সে এই কারবার করছে। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি সম্প্রতি নৌকাটা আবার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। তবে তিনি নৌকাটা কার কাছে ভাড়া দিয়েছিলেন, তার পরিচয় জানাননি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি নিয়ে বিদেশে মাদক পাচারের চেষ্টা
দেশে আসা মাদকের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই স্থানীয় মাদকসেবীরা ব্যবহার করে। তবে খুব ছোট একটি অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে ওমান, সৌদি আরব ও দুবাইয়ে পাচারের চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে ডিএনসি কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, বিমানবন্দরে উন্নত স্ক্যানার ও সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানোয় আকাশপথে মাদক পাচার এখন অনেকটাই কমে গেছে। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও বিদেশে মাদক পাঠানোর চেষ্টা রুখে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বড় বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে।
ডিএনসির আরেক সূত্রে গণমাধ্যমকে বলেন, পাচারকারীরা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় মাদক পাঠাতে কুরিয়ার সার্ভিসও ব্যবহার করেছিল। তবে কঠোর নজরদারির কারণে এই রুটটি ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
কেবল মিয়ানমার নয়, ভারতে সীমান্তেও একই চিত্র
লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে মাদকের এই ব্যবহার কেবল মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সীমান্তেও একই কৌশলে ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের বিনিময়ে বাংলাদেশি সোনা, ইলিশ মাছ ও অন্যান্য জিনিসপত্র আদান-প্রদান করা হচ্ছে। তারা জানান, হুন্ডির পাশাপাশি নগদ অর্থ ও সরাসরি জিনিসপত্রের বিনিময়ে ভারত সীমান্তেও এই অবৈধ মাদক বাণিজ্য চলছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারত থেকেও সরবরাহ করা মাদকের দামের বিপরীতে ওইসব পণ্যের মূল্য সমন্বয় করে নেওয়া হয়। ভারত সীমান্তে নগদ টাকার বদলে স্বর্ণ, ইলিশ মাছ এবং অন্যান্য চোরাচালান পণ্যের মাধ্যমেও মাঝেমধ্যে বকেয়া মেটানো হয়।
