পরিবেশবান্ধব পোকা দমন প্রযুক্তি
খায়রুল ইসলাম, গাজীপুর
এ গবেষণার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ খাদ্য দূষণ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং কৃষকের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সক্ষম হবে। এটি জৈব নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ…
বাংলাদেশের কৃষি খাত আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ফসল উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সমানভাবে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। প্রতিবছর দেশে বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় যা খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে এবং কৃষকদের বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। এর অতিরিক্ত ব্যবহার মাটি ও পানির দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং কৃষক ও ভোক্তাদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (IBGE) পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহ মোহাম্মদ নাইমুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় উদ্ভাবিত হয়েছে একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব সমাধান। স্থানীয় ছত্রাক Beauveria bassiana (BbF)-এর ট্যালক-ভিত্তিক ফর্মুলেশন। অধ্যাপক ড. শাহ মোহাম্মদ নাইমুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা International Organization for Biological Control (IOBC)-এর অফিসিয়াল জার্নাল Biocontrol-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় তুলা গাছকে মডেল ফসল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তুলা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি Spodoptera litura, সাদা মাছি ও জ্যাসিডসহ নানা ক্ষতিকর পোকার আক্রমণে দুর্বল। গবেষণায় দেখা গেছে, BbF প্রয়োগে তুলা গাছে পোকার ক্ষতি ৩৮.৭% কমেছে এবং জীবিত পোকার সংখ্যা ৫০% হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া, BbF প্রয়োগে S. litura-এর লার্ভা মৃত্যুর হার ও পিউপা বিকৃতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যা পোকার জীবন চক্রকে ব্যাহত করেছে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে BbF-এর ফোলিয়ার স্প্রে রাসায়নিক কীটনাশকের সমতুল্য কার্যকারিতা দেখিয়েছে। শুধু পোকা দমন নয়, বীজ প্রাইমিংয়ের মাধ্যমে গাছের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সর্বোচ্চ তুলা উৎপাদন (২.৩৯ টন/হেক্টর) অর্জিত হয়েছে। এই দ্বৈত সুবিধা জৈব পোকা দমন ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে BbF-কে টেকসই কৃষির জন্য একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফর্মুলেশনটির সংরক্ষণ যোগ্যতাও প্রশংসনীয়। চার ডিগ্রি সেলসিয়াস (4°C) তাপমাত্রায় ছয় মাসে কনিডিয়ার কার্যকারিতা মাত্র ১৭% হ্রাস পেয়েছে, যা মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার ও বিতরণের জন্য উপযোগী। এই অর্জন বাজারজাতকরণের পথে একটি বড় মাইলফলক। এটি এখন বাজারে ছাড়ার জন্য প্রস্তুত এবং এই পর্যায়ে শিল্প খাতের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কৃষি প্রযুক্তি কোম্পানির অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এটির বাণিজ্যিকীকরণ শুধু নিরাপদ বিকল্পই নয় বরং পরিবেশবান্ধব কৃষি শিল্প, গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ গবেষণার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ খাদ্য দূষণ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং কৃষকের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সক্ষম হবে। BbF-এর মতো জৈব নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সের তত্ত্বাবধানে USDA এন্ডোউমেন্ট প্রোগ্রামের (চতুর্থ পর্যায় BAS-USDA BSMRAU CR-13) অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় অধ্যাপক নাইমুল ইসলাম ও তার দল জৈব কীটনাশকের বিস্তৃত ব্যবহার, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ওই গবেষণার গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে বিজ্ঞান ও টেকসই কৃষির সমন্বয় অপরিহার্য। তুলা ছিল এই গবেষণার মডেল ফসল, তবে BbF-এর প্রয়োগ সম্ভাবনা অন্যান্য ফসলেও ব্যাপক। এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে পরিবেশবান্ধব সমাধান শুধু কার্যকরই নয় বরং একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
