পুরস্কার ঘোষণা বনাম নীরবতা: ইরান থেকে মার্কিন সেনার বেঁচে ফেরার লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান বিধ্বস্ত হলে বা প্রতিকূল পরিবেশে আটকা পড়লে একজন বৈমানিক কীভাবে নিজেকে রক্ষা করেন, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা রবি চৌধুরী।

২০০৮ সালে ইরাকে ‌‘পার্সোনেল রিকভারি সেন্টার’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই সাবেক কর্মকর্তা সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন উদ্ধারকারী দলের সক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।

অবসরপ্রাপ্ত সি-১৭ পাইলট রবি চৌধুরী জানান, মার্কিন উদ্ধারকারী দলগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তারা তাদের সহকর্মীকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ২৪ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে যায়। তার মতে, বর্তমানে নিখোঁজ থাকা ওই ক্রু সদস্য সম্ভবত নিজেকে শত্রুপক্ষের নজর থেকে আড়াল করে (ম্যাক্সিমাইজিং কনসিলমেন্ট) অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লুকিয়ে আছেন এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন যাতে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ধরা পড়া এড়াতে বৈমানিকদের নির্দিষ্ট কিছু কৌশল শেখানো হয়, যার মাধ্যমে তারা শত্রুর রাডার বা টহল দলের নজর এড়িয়ে নির্দিষ্ট মুহূর্তে সিগন্যাল পাঠিয়ে উদ্ধারকারীদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন।

নিজের এয়ার ফোর্স একাডেমির সারভাইভাল ম্যানুয়াল এবং প্যারাসুট কর্ড দিয়ে তৈরি বিশেষ ছুরি দেখিয়ে রবি চৌধুরী জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য সেনাদের বিশেষ ‘ইম্প্রোভাইজেশন’ বা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যুদ্ধবিমানের ইজেকশন বা জরুরি বহির্গমন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার মতে, বিমানের সামনের এবং পেছনের সিট থেকে বেরিয়ে আসার মধ্যে মাত্র ১.৫ সেকেন্ডের ব্যবধান থাকে। এই সামান্য সময়ের পার্থক্যের কারণেই হয়তো দুজন ক্রু সদস্য ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবতরণ করেছেন, যার ফলে একজনকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

সার্বিক উদ্ধার অভিযান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীরবতার বিষয়ে চৌধুরী বলেন, এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। হোয়াইট হাউসের এই নীরবতা মূলত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে কোনো ধরনের বিচ্যুতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করার সর্বোচ্চ সুযোগ দিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে শিগগিরই নিখোঁজ সেনাকে তার পরিবার ও বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে জীবিত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। শনিবার ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানানো হয় যে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে থাকা ওই সেনাকে খুঁজে বের করতে স্থানীয় সশস্ত্র উপজাতিদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই অভিযানে অংশ নেওয়া উপজাতিদের ‘সীমান্তের সাহসী প্রহরী’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের দেশপ্রেমের প্রশংসা করেছে।

ইতোমধ্যে বখতিয়ারি ও খুজেস্তান প্রদেশের যাযাবর উপজাতিরা রাইফেল হাতে পাহাড়ি গুহা ও দুর্গম অঞ্চলে নিখোঁজ সেনার সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, মার্কিন ওই বৈমানিক বর্তমানে নিজেকে আড়াল করে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করে আছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, তাদের নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আকাশসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে শত্রুপক্ষকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করা হবে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights