প্যারিসের কাছে ৭ বিলিয়ন ডলারের থিম পার্ক বানাবে ফ্রান্স-সৌদি আরব

অনলাইন ডেস্ক

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কাছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ইউরো বা ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল বিনোদনকেন্দ্র বা থিম পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ফ্রান্স ও সৌদি আরব।

সোমবার প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠকের পর এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে আয়োজিত বৈঠকের পর জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিমান চলাচল, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, প্যারিসের প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সেরজি-পন্তোয়াজ এলাকায় তিনটি থিম পার্ক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি পার্ক মাঙ্গা বা জাপানি কমিকভিত্তিক হতে পারে। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেবে সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের বিনিয়োগ শাখা কিদ্দিয়া।

প্রকল্পটি প্রায় ২২ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ম্যাক্রোঁ প্রকল্পটিকে ‘অসাধারণ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি ডিজনিল্যান্ড প্যারিসের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ের একটি নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরি করবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তার ‘চুজ ফ্রান্স’ উদ্যোগের সাফল্য হিসেবেও তিনি প্রকল্পটিকে তুলে ধরেন।

ম্যাক্রোঁ বলেন, বিশ্বের সামনে চমক দেখানো এখনও শেষ হয়নি। সৌদি আরব ও কিদ্দিয়া ফরাসি দক্ষতার ওপর যে আস্থা রেখেছে, তার জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

মাঙ্গা ও ‘ড্রাগন বল জেড’ থেকে প্রকল্পের ভাবনা
ফরাসি প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রিয়াদে ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠক থেকেই প্রকল্পটির ধারণার সূত্রপাত। ওই বৈঠকে দু’জনের মাঙ্গা এবং বিশেষ করে জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমে সিরিজ ‘ড্রাগন বল জেড’-এর প্রতি আগ্রহের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

এরপর সেই আগ্রহ থেকেই প্যারিসের কাছে মাঙ্গাভিত্তিক একটি বিনোদন পার্ক নির্মাণের ধারণা সামনে আসে।

তবে শুধু বিনোদন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না দুই দেশের সহযোগিতা। সোমবারের অনুষ্ঠানে জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিমান চলাচলে অর্থায়ন, পরিবহন ও স্বাস্থ্য খাতে বেশ কয়েকটি চুক্তি সই হয়েছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতায়ও জোর
দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের জন্য একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা অভিপ্রায়পত্রও সই হয়েছে। এর আওতায় সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রশিক্ষণ ও সামরিক প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কথা রয়েছে।

ফ্রান্সের জন্য সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবও ঐতিহ্যগত অংশীদারদের বাইরে নতুন কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে। ফলে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে প্যারিস।

সৌদি যুবরাজের সফরকালে ফরাসি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আরও দুটি বড় চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ফরাসি সামুদ্রিক লজিস্টিকস কোম্পানি সিএমএ সিজিএম সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের জেদ্দা ইসলামিক বন্দর উন্নয়নে সহায়তার জন্য ৪৩৪ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।

এছাড়া রেল পরিবহন কোম্পানি আলস্টম রিয়াদ মেট্রোর জন্য ট্রেন সরবরাহ করতে ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।

সৌদি যুবরাজের তৃতীয় ফ্রান্স সফর
মোহাম্মদ বিন সালমানের এবারের সফর ফ্রান্সে তার তৃতীয় সরকারি সফর। ঐতিহ্যগত অংশীদারদের পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার সৌদি প্রচেষ্টার মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।

চলতি মাসের শুরুতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের পর এটি ছিল সৌদি যুবরাজের প্রথম বিদেশ সফর।

অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকট নিয়েও যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ও হরমুজ নিয়ে আহ্বান
যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্স ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আলোচনার মাধ্যমে অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

দুই দেশ হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিকেও স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে তারা।
ফ্রান্স ও সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।

এছাড়া সৌদি আরব ও বাণিজ্যিক জাহাজে ইয়েমেনের হুথিদের হামলারও নিন্দা জানিয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে তারা।

সব মিলিয়ে, প্যারিসের কাছে বিলিয়ন ডলারের থিম পার্ক নির্মাণের চুক্তির পাশাপাশি ফ্রান্স-সৌদি সম্পর্ককে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষার বিস্তৃত অংশীদারত্বে নিয়ে যাওয়ার বার্তাই দিয়েছে ম্যাক্রোঁ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠক। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights