প্রার্থীরা ভোটারের কাছে, রাষ্ট্রদূতরা ক্ষমতার কাছে

মন্‌জুরুল ইসলাম

বাংলাদেশের নির্বাচন বা রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন ও ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব নতুন কিছু নয়। এবারের নির্বাচনে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে বিদেশিদের প্রভাব এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী শক্তির ব্যাপক উত্থান ঘটে। সে কারণে নির্বাচন মেকানিজমে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ভারত এখন পর্যন্ত তেমন সুুবিধা করতে পারছে না। তাই বলে শক্তিশালী প্রতিবেশী খুব চুপচাপ বসে আছে, এটা ভাবারও কোনো কারণ নেই। অপেক্ষায় আছে যথোপযুক্ত সুযোগের। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা এবং চীন এবারের নির্বাচনে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর। চীন বরাবরই একটু ধীরলয়ে কাজ করে। সব বিষয়ে নাক গলায় না। নিজস্ব বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থে চীন এক চুলও ছাড় দেয় না। তুরস্ক অতীতে কখনো বাংলাদেশে রাজনীতি, নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় ছিল না। এবারও সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে অনেকেই লিরার ঝনঝনানি শুনতে পান। লিরার গরমে অনেকেই এখন গরম। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে জোট গঠন, পরবর্তী সরকারের পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অনেক বেশি বলে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে। প্রার্থীরা যখন যার যার প্রতীক নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছেন, তখন বিদেশি বন্ধুরা আমাদের আগামী দিনের ক্ষমতার অঙ্ক কষছে। কোনো কোনো বিদেশি বন্ধু এক ধাপ এগিয়ে নির্বাচনি অঙ্কের যোগ-বিয়োগ, পূরণ-ভাগ করে যোগফল ইতোমধ্যে মিলিয়ে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেভাবে নির্বাচনের আগেই যোগফল মিলিয়ে রাখা হয়েছিল ২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও চতুর্থ গণভোটের বাকি আর মাত্র ১৩ দিন। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন পর্যন্ত আশঙ্কাজনক বা ভীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। চলছে জোটপ্রধান ও প্রার্থীদের কথার আক্রমণ। নানা রকম প্রতিশ্রুতি ও নতুন বন্দোবস্তের কথামালা। দেশের ভিতরে নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা রকম গুজব, বটবাহিনীর অপতথ্য প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সিয়ালদের নানা রকম পরামর্শ নিয়ে চলছে গবেষণা। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত হলেন আমাদের দেশে কর্মরত বিদেশি দূতাবাস ও দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা। অতীতে দেশের সব জটিল সময়েও তাঁদের তৎপরতা ছিল। কখনো তাঁরা আমাদের মন্ত্রণা দেন, কখনো দেন কুমন্ত্রণা। কখনো সরকার ফেলে দেওয়ার, কখনো সরকারে বসানোর কলকাঠি নাড়েন। দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক প্রধান, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত রথী-মহারথীরা যেন বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সান্নিধ্যে তৃপ্ত থাকেন। দেশের মানুষ নয়, বিদেশিরা কীভাবে সন্তুষ্ট থাকবেন সেজন্য সবাই জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেন। আমাদের রাজনীতি ও সরকারের ওপর কখনো দাদা-দিদি, কখনো সাহেব-ম্যামদের প্রভাব থাকে অনেক বেশি। বিদেশে আমাদের ৮১টি দূতাবাস ও মিশন আছে। ওইসব দেশেও সংকট হয়, নির্বাচনও হয়। কোথাও বা আমাদের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও গঠিত হয়। অথচ আমাদের কোনো রাষ্ট্রদূত বা মিশনপ্রধানের সঙ্গে ওইসব দেশের সরকারসংশ্লিষ্ট কেউ অথবা রাজনৈতিক দলের কেউ মিটিং করার খবর পাওয়া যায় না। তাহলে স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমাদের মেরুদণ্ড কেন সোজা হলো না? এখনো আমরা কেন আমাদের নির্বাচন নিজেদের মতো করে করতে পারি না? আমরা কেন বিদেশিদের বলতে পারি না, আমাদের নির্বাচন নিয়ে তোমাদের এত মাথাব্যথা কেন?

নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি যদি বিদেশিদের হস্তক্ষেপ গ্রাহ্য না করে নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেন, তাহলে আমাদের নোবেলজয়ীকে কেন বিদেশিদের পরামর্শ নিতে হয়? তিনি কেন বিদেশিদের বলতে পারেন না যে আমাদের নির্বাচন আমাদেরই করতে দিন
প্রার্থীরা ভোটারের কাছে, রাষ্ট্রদূতরা ক্ষমতার কাছেপৃথিবীর আটটি অঞ্চলে আমাদের দূতাবাস ও মিশন আছে মোট ৮১টি। এর মধ্যে আফ্রিকায় নয়টি, আমেরিকা অঞ্চলে নয়টি, পূর্ব এশিয়া ও এশিয়া প্যাসিফিকে সাতটি, পূর্ব ইউরোপ এবং সিআইএস অঞ্চলে ছয়টি, দক্ষিণ এশিয়ায় ১২টি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়টি, পশ্চিম এশিয়ায় ১৩টি, পশ্চিম ইউরোপ ও ইইউ অঞ্চলে ১৬টি। এসব দূতাবাস ও মিশনে আমাদের দক্ষ কূটনীতিকরা দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ শ্রীলঙ্কা ও নেপালে নিকট অতীতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। জেন-জি আন্দোলনে সরকার পতন হয়েছে বাংলাদেশ ও নেপালে। আমাদের সরকার পতন হয়েছে চব্বিশের ৫ আগস্ট। নেপালের সরকার পতন হয় পঁচিশের ৯ সেপ্টেম্বর। সরকার পতনের পর আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। নেপালেও অন্তর্বর্তী সরকার হয়েছে। আমাদের সরকারের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে সময় লাগল ১৮ মাস আর নেপাল সরকার ছয় মাসের মধ্যেই নির্বাচন করতে যাচ্ছে। আমাদের নির্বাচন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এবং নেপালের নির্বাচন ৫ মার্চ। আমাদের প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে ভোটের জন্য মাঠে নেমে গেছেন আর নেপালের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২০ জানুয়ারি। ওই দেশের প্রার্থীরাও মাঠে নেমেছেন। আমাদের এখানে যেমন নির্বাচনি জোট হয়েছে; নেপালেও জোট হয়েছে। আমাদের মতোই নেপালেও দুই কক্ষের পার্লামেন্ট। আমাদের নির্বাচন কেন্দ্র করে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও মিশনপ্রধানদের দৌড়ঝাঁপ খুব বেশি চোখে পড়ছে। ছোটবড় সব দলের নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দেওয়ার কাজটি তাঁরা খুব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করে যাচ্ছেন। তাঁদের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে গণতন্ত্র নেই, ভোটাধিকার নেই, মানুষের মৌলিক অধিকার নেই, আইনের শাসন নেই। মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে ঠিক করার দায়িত্ব তাঁদের। অন্যদিকে নেপালের নির্বাচন নিয়ে অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতদের তেমন কোনো দৌড়ঝাঁপ নেই। এমনকি নেপালে আমাদের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের সে দেশের সরকারের কারও সঙ্গে বা কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের খবর পাওয়া যায়নি। নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি যদি বিদেশিদের হস্তক্ষেপ গ্রাহ্য না করে নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেন, তাহলে আমাদের নোবেলজয়ীকে কেন বিদেশিদের পরামর্শ নিতে হয়? তিনি কেন বিদেশিদের বলতে পারেন না যে আমাদের নির্বাচন আমাদেরই করতে দিন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কেন জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারে না? সতীত্ব প্রমাণের জন্য আমাদের নির্বাচন কমিশনকে কেন বিদেশিদের সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে?

২০২৬ সালের নির্বাচনে অনেক অঘটনই ঘটতে পারে। এখন যাঁরা ওপরে ওপরে নির্বাচনটাকে কঠিন মনে করছেন, ভিতরে ভিতরে কর্মীরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন, তাঁদের জন্য এবার দুঃসংবাদ সৃষ্টি হতে পারে। মনে রাখতে হবে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছিল। অনেক নেতা নতুন মুজিবকোট, নতুন স্যুট বানিয়েছিলেন। কে কোন মন্ত্রণালয় নেবেন, সে সিদ্ধান্তও নিজে নিজেই নিয়েছিলেন। আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব উল্টে গিয়েছিল। বিদেশিদের শলাপরামর্শে যাঁরা জোট গঠন করে ক্ষমতার চেয়ারের দিকে তাকিয়ে অতি উচ্চাশায় মুচকি হাসছেন, তাঁদের সেই হাসিও ম্লান হয়ে যেতে পারে। একচেটিয়া জেন-জি ভোট প্রাপ্তির আত্মবিশ্বাসে যাঁরা নির্বাচনি খেলার মাঠে নতুন স্ট্রাইকার বা বোলার, তাঁদের মনে রাখতে হবে, চব্বিশ আর ছাব্বিশ এক নয়। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে যাঁরা হাসি-আনন্দে থাকার কথা ভাবছেন, তাঁরা কাঁদতেও পারেন। অনেকে কাঁদার মানসিক শক্তিও হারিয়ে ফেলতে পারেন। পুরোনো ভোটার, নতুন ভোটার, নারী ভোটার এবং প্রবাসী ভোটার সবাই এবার ফ্যাক্টর। কোনো একটি ফ্যাক্টরে ভর করে নির্বাচনি পুলসিরাত পার হওয়া যাবে না। নানান চিন্তার, নানান মেজাজের ভোটার ও বিদেশিদের লম্বা হাত হবে এবার নির্বাচনে অঘটনঘটনকারী। সরকারের ভিতরেও আছে ২০০৮-এর নির্বাচনের কারিগররা। এঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন নতুন কারিগর। সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানালেও শেষ পর্যন্ত সরকার নিজেই বিশেষ কোনো পক্ষে বাতাস দেবে কি না সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সরকারের উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারীরা রাজনীতিতে পরিপক্ব না হলেও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের ঘোলা পানি খাওয়ানোর দক্ষতা ইতোমধ্যে ভালোই রপ্ত করেছেন। তাঁরাও এখন অনেক বড় খেলোয়াড়। এমন আলোচনাও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে যে সরকারের একটি বড় অংশ ও বিদেশিরা আগামী সংসদকে ঝুলিয়ে দিতে পারে।

বিগত সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ‘খেলা হবে’ আওয়াজ তুলেছিলেন শামীম ওসমান। সেই আওয়াজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির কণ্ঠেও ঝড় তুলেছিল। সবশেষে সেটা বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তৃতার নিজস্ব ব্র্যান্ড হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তখন সব বিরোধী দলের বিরুদ্ধে খেলার হুমকি দিয়েছিল। সে সময়ের সব বিরোধী দল এখন নিজেরা নিজেরা খেলছে। কেউ খেলছে ধর্ম নিয়ে, কেউ খেলছে কর্ম নিয়ে। কেউ ইহকালের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কেউ আবার ইহকাল ও পরকালের গ্যারান্টিও দিচ্ছে। ওই দিকে পুরোনো খেলোয়াড় আওয়ামী লীগের নাটাই এখন ভারতে। ১২ ফেব্রুয়ারির আগে-পরে সেই নাটাই কোন দিকে টান দেবে সেটাও লক্ষ রাখতে হবে। সুতরাং রাজা মিয়ার পায়ে বল, দুই গোলকিপারই সাবধান!

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

manju209@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights