ফুলবাড়ীতে শিক্ষা অফিসে শিক্ষকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় ও বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দীর্ঘদিন ধরে দাপ্তরিক কাজ করার সুযোগে এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায়, ভ্রমণ ভাতা গ্রহণে অনিয়ম এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলার প্রায় ১৫০ জন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। অভিযুক্ত শিক্ষক মো. রোকনুজ্জামান ধর্মপুর ব্যাপারীটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

অভিযোগকারী কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক খাইরুল ইসলামের দাবি, কিন্ডারগার্টেনের পাঠদানের অনুমতি-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তার কাছ থেকে অসদুপায় অবলম্বন করে রোকনুজ্জামান দুই ধাপে প্রথমে ৫ হাজার ও পরে ১৮০০ টাকা নেওয়ার পর আরো ১২ হাজার টাকার দাবি করেছেন। রোকনুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে কম্পিউটারে দাপ্তরিক কাজ করছেন। একটি বিল শীট বের করে দেওয়ার জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, শ্রান্তী বিনোদন ভাতার বিলের ক্ষেত্রে ২০০ টাকা এবং তাছাড়া রোগাক্রান্ত শিক্ষকদের শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তার স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করার কথা বলে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ভ্রমণ না করেও নিজের নামে ভ্রমণ ভাতা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়াও পূর্ব চন্দ্রখানা জকারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রফিকুল ইসলাম নামে এক প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে ১৮০০ টাকার ভ্রমণ বিল করার জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের অন্য এক সহকারী শিক্ষকের বদলী বাবদ ১৫ হাজার টাকায় চুক্তি করে অগ্রিম তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, রোকনুজ্জামান একজন সহকারী শিক্ষক। স্যারেরা তাকে যদি কাজের জন্য শিক্ষা অফিসে রেখে থাকে, কাজ করবে কিন্তু টাকা নিবে কেন? আমি একজন প্রধান শিক্ষক হয়েও কেন সে আমার কাছে টাকা দাবি করবে এবং নিবে। বিষয়টা আমি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

সম্প্রতি কিন্ডারগার্টেনের পাঠদানের অনুমতি-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানপ্রতি ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। খড়িবাড়ী বাজার এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেনের কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিন্ডারগার্টেনের মালিক বিষয়টি শিক্ষক নেতাদের ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানান। তবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, রোকনুজ্জামান এসব অর্থের ভাগ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা পান বলেও দাবি করতেন।

রোকনুজ্জামানের নিজ কর্মস্থল ধর্মপুর ব্যাপারীটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়টির নামে পরপর দুইবার দেড় লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকা বরাদ্দের জন্য শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত কাগজ পাঠানো হয় এবং বরাদ্দ অনুমোদিত হয়। অথচ তাঁদের দাবি, এ ধরনের বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান মেনে আবেদন করার বিধান রয়েছে এবং বরাদ্দের অর্থে বাস্তবে কোনো কাজ হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। বরাদ্দের অনুমোদনপত্র, অর্থ ছাড়ের নথি, ব্যয়ের হিসাব ও বিদ্যালয়ের বাস্তব অবস্থা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, রোকনুজ্জামানকে শিক্ষা অফিসে কাজ করার জন্য সংযুক্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্তির কথা লেখা থাকলেও কোথায় সংযুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই বলে তাঁদের অভিযোগ। দীর্ঘদিন শিক্ষা অফিসে অবস্থান করায় তাঁর নিজ বিদ্যালয়ের পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও অভিযুক্ত শিক্ষককে শিক্ষা অফিসে রাখার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, অফিস আদেশের ভিত্তিতেই তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ডেপুটেশনে রয়েছেন। তাঁর দেওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল ফুলবাড়ী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাঁকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে কম্পিউটার-সংক্রান্ত কাজ সম্পাদনের জন্য সাময়িক সংযুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একই তারিখে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে যোগদানপত্র জমা দেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান ব্যাহত করে শিক্ষা অফিসে এভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে রোকনুজ্জামান বলেন, “আমাকে আদেশ করা হয়েছে, তাই আমি আদেশ পালন করছি। আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বলতে পারবেন।” অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষকদের মাঝে সিনিয়র জুনিয়র গ্রুপিং আছে। গ্রুপিংয়ের কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।

ধর্মপুর ব্যাপারীটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, অফিস থেকে স্যারেরা আদেশ দিয়েছেন জন্য রোকনুজ্জামান ডেপুটেশনে শিক্ষা অফিসে কর্মরত আছেন। এতে আমার প্রতিষ্ঠানের কোনো সমস্যা নাই। আবার যদি অফিস থেকে ফেরত দেওয়া হয় তাতেও আমার কোনো আপত্তি নাই। পরপর দুইবার বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠান অতি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দুইবার বরাদ্দ পেয়েছি। বরাদ্দকৃত অর্থ আমরা যথাযথভাবেই ব্যয় করেছি।

প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার অভিযোগ ওঠার পর আমরা শিক্ষা অফিসে যাই। পরে স্যারের সাথে কথা বলার পর রোকনুজ্জামানকে শিক্ষা অফিস থেকে প্রস্থান করানো হয়েছে। তবে তিনি বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন কিনা তা আমার জানা নেই। নানা অনিয়মের ব্যপারে তিনি বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা আবেদন জানিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে যেন সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে আমাদের উপজেলার কোনো শিক্ষক যেন হয়রানির শিকার না হয়।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সদস্য সচিব নুর ইসলাম বলেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক আদেশ, বরাদ্দের নথি, ভাতা ও বিলের হিসাব এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের আহবায়ক গোলাম মর্তুজা বকুল বলেন, যে পোস্টের নামে রোকনুজ্জামানকে ডেপুটেশনে শিক্ষা অফিসে নিয়ে আসা হয়েছে, সেই পোস্টে দুইজন ব্যক্তি কর্মরত আছেন। তারপরও রোকনুজ্জামানকে কেন ডেপুটেশনে নিয়ে আসা হয়েছে তা বোধগম্য নয়। অভিযুক্ত রোকনুজ্জামানের নামে একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও অফিস তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে শিক্ষকদের নেতা হিসেবে আমি চাই যে, আর কোনো শিক্ষককেই যেন শিক্ষা অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে না হয় এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট সুদৃষ্টি কামনা করছি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমি কোনো প্রকার অভিযোগ পাইনি। রোকনুজ্জামানের একাধিক টাকা নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন এরকম টাকা নেওয়ার অনেক অভিযোগ উঠতেই পারে সেটা তো প্রমাণ করতে হবে। পরে আবার প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষকরা আমার কাছে একটা অভিযোগ নিয়ে আসছিল আমি সেটা গ্রহণ করিনি। তবে রোকনুজ্জামানকে তার কর্মস্থলে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights