বগুড়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলায় দর্শনার্থীদের ঢল

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। চারপাশে দর্শকদের ভিড়। হঠাৎ ঢোলের তালে তালে শুরু হলো লাঠির ঝনঝন শব্দ। খালি পায়ে মাঠে নেমে একে অপরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন লাঠিয়ালরা। কখনো আক্রমণ, কখনো প্রতিপক্ষের আঘাত ঠেকানো, আবার কখনো দ্রুত কৌশলে পাল্টা আঘাত—লাঠিয়ালদের এমন দুর্দান্ত নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে মাঠের চারপাশ থেকে হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন হাজারো দর্শক। মনে হচ্ছিল, যুদ্ধের ময়দানে একদল যোদ্ধা প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় নেমেছেন।

বগুড়ার শেরপুরে দুই দিনব্যাপী গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলায় দেখা যায় এমন দৃশ্য। রবিবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় খেলার সমাপনীতে ঢোলের তালে তালে লাঠিয়ালদের নৈপুণ্য আর হাজারো দর্শকের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামের স্কুল মাঠ। হারিয়ে যেতে বসা আবহমান বাংলার এই লোকজ খেলাকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।

জানা যায়, শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের শুবলি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে গ্রামবাসীর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলার আয়োজন করা হয়। শনিবার (২৯ আগস্ট) থেকে রবিবার পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে খেলা। সমাপনী দিনে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন বাংলার প্রাচীন এই লোকজ আয়োজন।

মাঠের মাঝখানে লাঠি হাতে মুখোমুখি অবস্থান নেন লাঠিয়ালরা। ঢোলের তালে তালে শুরু হয় তাদের ছন্দময় লড়াই। প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার পাশাপাশি সুযোগ বুঝে পাল্টা কৌশল দেখান তারা। কখনো দ্রুত পায়ের কৌশল, কখনো লাঠির ঘূর্ণন, আবার কখনো একসঙ্গে কয়েকজনের আক্রমণ ও প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে পুরো মাঠ পরিণত হয় রোমাঞ্চকর এক প্রদর্শনীতে।

লাঠি খেলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন উৎসব, মেলা, বিয়ে, নবান্ন, পূজা-পার্বণ কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনে লাঠি খেলা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। গ্রামের প্রবীণ লাঠিয়ালরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শারীরিক কসরত ও দলগত কৌশলের মাধ্যমে এ খেলার চর্চা করে আসতেন।

আগের দিনে কোনো কোনো গ্রামে লাঠিয়াল দল ছিল আলাদা পরিচিতির অংশ। ঢোলের শব্দ শুনলেই মানুষ ছুটে যেতেন খেলার মাঠে। লাঠির ছন্দ, ঢোলের বাদ্য আর দর্শকদের উল্লাসে মুখর হয়ে উঠত গ্রামীণ জনপদ। কিন্তু আধুনিক বিনোদন ও প্রযুক্তির বিস্তার, মাঠের সংকট এবং আয়োজন কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই লোকজ খেলার চর্চা।

শুবলি গ্রামের এই আয়োজন যেন সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন পর ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা দেখতে পেয়ে অনেক প্রবীণ দর্শক ফিরে গেছেন তাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের চোখে দেখা গেছে কৌতূহল ও বিস্ময়। তাদের কাছে লাঠি খেলা হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার পুরোনো সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক নতুন অভিজ্ঞতা।

স্থানীয়রা বলেন, আধুনিকতার চাপে গ্রামীণ অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। লাঠি খেলা সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। একই সঙ্গে লাঠিয়ালদেরও এ খেলা ধরে রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আয়োজকরা জানান, গ্রামের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও আনন্দ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরতেই এ আয়োজন করা হয়েছে।

সমাপনী দিনের আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পিয়ার হোসেন পিয়ার, উপজেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি রাফি আলামিন, আবু সাইদ, আলেক উদ্দিন বাবু, ইউসুফ আলী, মোহাম্মদ আলীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পিয়ার হোসেন পিয়ার বলেন, ‘এমন আয়োজন শুধু একটি খেলা নয়, এটি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শেকড়ের সঙ্গে মানুষের নতুন করে পরিচিত হওয়ার একটি উপলক্ষ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights