বহিষ্কৃতদের ক্ষমায় বিএনপি

শফিউল আলম দোলন

দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর থেকে সব ধরনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর মাঝে চাঙাভাব ফিরিয়ে এনে দলকে শক্তিশালী করাই প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে চলমান আন্দোলন আরও বেগবান করে চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার আগে সব ভেদাভেদ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুছে ফেলতে চান দলের হাইকমান্ড। এ জন্য তিনি সাধারণ ক্ষমার আদলে সবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে সবাইকেই দলে ফিরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটা হতে পারে একযোগে গণহারে, কিংবা পর্যায়ক্রমে কয়েক দফায়, যার পূর্ণ এখতিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল ও কেন্দ্রীয় দফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, মূল দল ও অঙ্গসংগঠন মিলে দুই শতাধিক নেতা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছেন। মূল দলসহ কৃষক দল, ছাত্রদল ও যুবদলের অনেক নেতাই দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রতিনিয়ত আন্তরিকভাবে অংশ নিচ্ছেন। অনেকে প্রায় প্রতিদিনই নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও যাচ্ছেন। অনেকের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন কয়েক বছর ধরে পড়ে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে প্রত্যাহার হচ্ছে না। দলের অপেক্ষাকৃত বড় ও প্রভাবশালী নেতারা তাদের আধিপত্য ও নেতৃত্বের সুবিধার্থে এবং ব্যক্তিস্বার্থেই বেশির ভাগ বহিষ্কৃত নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত তাদের প্রভাব ও লবিং-তদবিরের কারণেই বিএনপির বেশির ভাগ নেতা-কর্মী ছোটখাটো ভিত্তিহীন অভিযোগে আজ বহিষ্কৃত। প্রভাবশালী নেতাদের স্বার্থ বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হলেই তারা ঠুনকো অভিযোগে কেন্দ্রে অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের বহিষ্কারাদেশ প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকেন। পরে সেগুলো যাতে প্রত্যাহার না হয় সে জন্যও তারা প্রভাব খাটান এবং তদবির করে থাকেন। এসব বিষয় চিন্তা করেই দল ও আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপির হাইকমান্ড তারেক রহমান এবার সবাইকে আবারও এক কাতারে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানা গেছে, প্রথম ধাপে বিএনপির শতাধিক নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হতে পারে। তৃণমূলকে শক্তিশালী এবং চলমান আন্দোলনকে বেগবান করার স্বার্থে এসব নেতাকে দলে ফেরানো হচ্ছে, যাদের বেশির ভাগই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বহিষ্কার হয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ প্রভাবশালী নেতাদের ষড়যন্ত্রের বলি হয়েছেন। এলাকায় কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা কুশলাদি বিনিময়ের ছবি দেখা যাওয়ার অভিযোগেও অনেক নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন। আবার নিজ দলের বহিষ্কৃত কোনো নেতার এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার অপরাধেও বহিষ্কৃত হয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ নাসিরের মতো শিক্ষিত উদীয়মান অনেক নেতা। কয়েক মাস আগে দলের স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল বৈঠকেও এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় দফতরের মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আবেদন করার পর অতীত অপরাধের ধরন এবং বর্তমান কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের দলে ফিরিয়ে আনার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তবে শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পর্কে উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিয়ে কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য করে যারা বহিষ্কার হয়েছেন, তাদের ব্যাপারে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এসব তথ্য জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, আগামী দিনের আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিএনপি। তাদের দলে ফিরিয়ে আনতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সর্বময় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনও হতে পারে, দফতর থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বহিষ্কৃত নেতাদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হবে। কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধ না করে থাকলে সবাইকেই গণহারে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে এমন শতাধিক নেতা রয়েছেন, যারা ত্যাগী ও পরীক্ষিত। তারা কেন্দ্রীয় দফতরে আবেদন করলে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হবে। তবে দলীয় হাইকমান্ড সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন এ ধরনের বেশ কয়েকজন নেতাকে দলে ফেরানোর বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এসব বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দলের কেন্দ্রীয় দফতর সূত্র অনুযায়ী, বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা কেন্দ্রীয় দফতরে আসেনি। তবে নিয়ম অনুযায়ী বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের সুপারিশ নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে উত্থাপন করা হয়ে থাকে। তিনি বিবেচনা করলে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হবে। দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি দলগতভাবে বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিলেও তা অমান্য করে অংশ নেওয়ায় ২০৫ জন নেতাকে তখন বহিষ্কার করা হয়। এর পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে আরও দেড় শতাধিক নেতা বহিষ্কার হন। এ ছাড়া নানা কারণে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে আরও বহিষ্কার হন ৩০ নেতা। এর মধ্যে গত তিন বছরে শতাধিক নেতার দলীয় দফতরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে মহাসচিবের বাসায় হামলার ঘটনায় বহিষ্কৃত ১৮ জনের মধ্যে তিন নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়। এ ছাড়া নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম কিরণ, সুনামগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সভাপতি মদিনা আক্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাধীন ভোলাহাট উপজেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সহ-সভাপতি শাহনাজ খাতুন, নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আবু নাছের, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. আশরাফুল হক, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. মঞ্জিল হোসেন ভিপি, নাটোর জেলা সদর উপজেলাধীন পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ এমদাদুল হক আল-মামুনসহ বেশ কয়েকজন নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয় গত বছর। এখনো শতাধিক নেতার আবেদন দলের কেন্দ্রীয় দফতরে রয়েছে। খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুও প্রায় বছর খানেক আগে কেন্দ্রীয় দফতরে আবেদন করেছেন। সেখানে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত খুলনা বিভাগীয় সমাবেশেও তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের সদস্যদের আহ্বানে যোগ দিয়েছেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। এর পরও এখনো তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। এ ছাড়া একসঙ্গে বহিষ্কার হয়েছিলেন ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট, ইখতিয়ার কবির, জয়দেব জয়, মামুন বিল্লাহ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ, বায়েজিদ আরেফিন, সহ-সাধারণ সম্পাদক দবির উদ্দিন তুষার, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত, আবদুল মালেক এবং সদস্য আজীম পাটোয়ারী, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহিরউদ্দিন তুহিন। তারা সবাই ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা। এখনো তারা দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও। এমনকি প্রত্যাহারের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা একমত হন। কিন্তু অজানা কারণে এখন পর্যন্ত এই ১২ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সবার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা চান বিএনপির হাইকমান্ড, যে কারণে বিগত দিনে যাদের বিভিন্ন অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের আবারও স্বপদে রাখতে চায় দলটি। এ ক্ষেত্রে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও হাইকমান্ডের আনুগত্য থেকে যারা দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের দলে ফেরানোর বিষয়ে কোনো ধরনের আপত্তি থাকবে না। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে অনেক প্রভাবশালী নেতা আছেন, যারা নানা কারণে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তারা বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান পাননি। কারণ সংশ্লিষ্ট এলাকায় যারা সংসদ নির্বাচন করতে চান, তারা দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভুল বুঝিয়ে তাদের আবেদনের বিষয়ে সমাধান করতে দেন না। কিন্তু কারও স্বার্থ না দেখে এখন দল ও আন্দোলনের জন্য বিগত দিনে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা উচিত বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব দিক বিবেচনা করেই হাইকমান্ড এবার সবাইকে ক্ষমা করে দিয়ে দলে ফিরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights