বাঙ্গালী নদীর ভাঙনের মুখে ত্রিমোহনী সেতু

সাইফুল মিলন, গাইবান্ধা:

‎উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোতে পানি কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্রোতের তীব্রতা। এর প্রভাবে জেলার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদীতে ৪০টি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। এরই মধ্যে বাঙ্গালী নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলজিইডির প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ত্রিমোহনী সেতু। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সেতুর সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

‎সরেজমিনে ত্রিমোহনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে পানি অনেকটা কমেছে। তবে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাঙ্গালী নদীর তীরে ভাঙন শুরু হয়েছে। সেই ভাঙন ত্রিমোহনী সেতুর পাশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

এদিকে জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি কখনো কমছে, আবার কখনো বাড়ছে। তবে চলমান এই বন্যার মৌসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। এ বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকেই গাইবান্ধা ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়া নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী ৪০টি পয়েন্টে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি, সড়কসহ নানা স্থাপনা।

বুধবার (৫ আগস্ট) গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুপুর ১২টার তথ্য অনুযায়ী জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১৩ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১২৬ সেমি, ঘাঘট নদের পানি ১১ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৯১ সেমি, করতোয়া নদীর পানি ৩০ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৯৩ সেমি ও তিস্তা নদীর পানি ১৭ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসাীমার ৩১ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক মাস ধরেই ত্রিমোহনী সেতু এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বাঙ্গালী নদীর ত্রিমোহনী ঘাট এলাকায় সিসি ব্লক না বসানোর কারণে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় স্রোতের তোড়ে সেতুর একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। সেতুর সংযোগ সড়কটি ভেঙে গেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের সঙ্গে সাঘাটার বোনারপাড়া ও কচুয়া ইউনিয়নের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে হাজারো মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে।

ত্রিমোহনী সেতুর পাশের বাসিন্দা শিউলি বেগম (৫৫) বলেন, রাত হলে ঘুম আসে না। কখন যে নদীতে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। কত মানুষ আসে-যায়, কিন্তু কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। নদীভাঙন রোধে কেউ কোনো উদ্যোগও নেয়নি।

একই কথা বলেন, রামনগর গ্রামের মকবুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, হাবিজার রহমান, আব্দুল মতিন ও মোকছেদুর রহমান। তারা বলেন, নদীভাঙনের কারণে সেতুটিসহ গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কও হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সেতু ও সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ফরমান আলী বলেন, ত্রিমোহনী সেতুর দুই পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিসি ব্লক বসালেও গত সাত বছরে সেতুর নিচের অংশে সিসি বøক বা জিওব্যাগ ফেলা হয়নি। এ কারণেই বর্তমানে ওই স্থানে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।

‎কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার বলেন, গোবিন্দগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলার সংযোগকারী ত্রিমোহনী সেতুর পাশে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সেতুর সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর বলেন, ত্রিমোহনী সেতু সংলগ্ন নদীভাঙনের বিষয়টি জেনেছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে। ভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।

সাঘাটা উপজেলা প্রকৌশলী (এলডিইডি) নয়ন রায় বলেন, ভাঙন প্রতিরোধের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড দেখবেন।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙন রোধে জেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে কাজ চলমান রয়েছে।

‎গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ বলেন, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights