বিরল কমলাবতী সাপের সংখ্যা বাংলাদেশে বাড়লো কীভাবে?
অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর আগে প্রথমবারের মতো দেখা পাওয়া বিরল কোরাল রেড কুকরি বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত কমলাবতী সাপ এখন গবেষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে খুব কমবার নথিভুক্ত হওয়া এই সাপটি গত কয়েক বছরে শুধু পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় পাওয়া গেছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, কমলা-লাল বর্ণের এই সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম Oligodon kheriensis। ১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রথম এর সন্ধান পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি মূলত ভারতের উত্তরাঞ্চল ও নেপালের হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সাপটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়। পরে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Journal of Asia-Pacific Biodiversity-তে এ বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ২০২১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ৬৬টি কমলাবতী সাপ উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে ১২-১৩টি ছিল বাচ্চা এবং বাকিগুলো পূর্ণবয়স্ক। প্রথমে পঞ্চগড়ে পাওয়া গেলেও পরে ঠাকুরগাঁওয়েও এ প্রজাতির সাপের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি সাপ উদ্ধার হলেও সেগুলোর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি।
তিনি জানান, সম্প্রতি ৫ ও ৬ জুলাই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চৌরঙ্গী বাজার এলাকার একটি ধানক্ষেতে মাছ ধরার জন্য পাতা রিং জালে দুটি কমলাবতী সাপ ধরা পড়ে। এর মধ্যে ৬ জুলাই উদ্ধার হওয়া সাপটি প্রায় সাড়ে তিন ফুট দীর্ঘ, যা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া সবচেয়ে বড় কমলাবতী সাপ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় একটি বাঁশঝাড়ে মাটি খননের সময় মা সাপসহ আটটি সদ্য ফুটে বের হওয়া বাচ্চা পাওয়া যায়। ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উদ্ধারকারীদের ধারণা, এ প্রজাতির সাপ একবারে ৮ থেকে ১২টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, কমলাবতী সাপ বিষহীন (নন-ভেনোমাস), আকারে তুলনামূলক ছোট এবং অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির। এটি সাধারণত নরম মাটির নিচে একাকী বসবাস করে।
বাংলাদেশে সাপটির সংখ্যা কেন বাড়ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা এখনো নেই। তবে অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, বনভূমি ধ্বংস এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচলের ধরনে পরিবর্তন আসছে। ফলে তারা নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হয়ে বসতি গড়ে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও হিমালয় অঞ্চলের তুলনামূলক কাছাকাছি এবং উঁচু ভূমি হওয়ায় এই প্রজাতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ কারণে উত্তরাঞ্চলে কমলাবতী সাপের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, এ প্রজাতির খাদ্যাভ্যাস, জীবনচক্র, প্রজনন ও বিস্তৃতি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর বৈশ্বিক রেড লিস্টে সাপটির সংরক্ষণ অবস্থান চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। ২০২৬ সালের হালনাগাদ মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
