বিশ্বকাপ ঘিরে জুয়া রমরমা

সাইফ ইমন

আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে দেশে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার চক্র। খেলার উন্মাদনা পুঁজি করে দেশবিদেশের বিভিন্ন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-ভিত্তিক গ্রুপে চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। এ ছাড়াও পাড়ামহল্লায় চায়ের দোকান থেকে অভিজাত ফ্ল্যাটেও হরহামেশাই বসছে জুয়ার আসর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়েরও অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে। শুধু বিশ্বকাপ ঘিরেই হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন তারা। জুয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের পুরোনো আইন। সিআইডির সাইবার সেন্টার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। বর্তমানে ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং আইনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ১৫৮ বছরের পুরোনো। এ আইনে সকালে আটক হলেও বিকালে জামিন পাওয়ার সুযোগ থাকে। এ ছাড়া জুয়া খেলার জন্য মাত্র ২০০ টাকা জরিমানা এবং সর্বোচ্চ দুই মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, আগে বহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের আওতায় কিছু ক্ষেত্রে মামলা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে সেই সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের সময় জুয়ার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে বাজি ধরতে গিয়ে অনেকে প্রথমে অল্প টাকায় শুরু করলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সময় অনলাইন বেটিংয়ে নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। জুয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি, ঋণের বোঝা এবং মানসিক অবসাদ বাড়ছে। অতীতে অনলাইন জুয়ায় বিপুল অর্থ হারিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক তরুণ ও শিক্ষার্থী জুয়ার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বারবার বাজি ধরার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত তাদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে পরিস্থিতি আরও খারাপে দিকে যাচ্ছে। নিঃস্ব হয়ে যাবে অনেক পরিবার। এদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জুয়ার প্রচারণার ধরনেও এসেছে নতুন মাত্রা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং সাইট এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জনপ্রিয় তারকা, খেলোয়াড় কিংবা পরিচিত মুখের আদলে এআই অ্যাভাটার তৈরি করছে। এসব ভার্চুয়াল চরিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে এসব প্রচারণাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন। হোয়াইট হ্যাকার প্রযুক্তিবিদ ইকরামুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, ব্যাংকিং চ্যানেল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অর্থ বিদেশি বেটিং সাইটে চলে যাচ্ছে। এতে একদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অর্থ পাচারের ঝুঁকি। সম্প্রতি জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে আত্মহননের ঘটনা বাড়ছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে নিঃস্ব হয়ে এক সরকারি চাকরিজীবী ১০ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেন। একই এলাকায় কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া ২২ হাজার টাকা জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন। সেই টাকা ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ বন্ধুরা তাকে হত্যা করে। কক্সবাজার পৌরসভার এসএম পাড়ার ইমরান (২৮) অনলাইন জুয়ার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। বগুড়ায় অনলাইন জুয়া কেন্দ্র করে খুন, আত্মহত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যশোরেও জুয়া খেলতে গিয়ে ঋণের চাপে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি।

মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, অনলাইনে অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে পুরো দেশে। সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে চক্রাকার হারে। আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। এসব অপরাধ ঠেকানোর জন্য প্রয়োজন পুলিশ বাহিনীর মতো আরেকটি বিশেষ বাহিনী করা। সেই সঙ্গে উন্নত আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য বিশেষ ট্রেনিং সারা বছর চালু রাখা উচিত। কারণ প্রতিদিনই প্রযুক্তি আপগ্রেডেড আসছে। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য সবার এগিয়ে আসতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights