বিষাক্ত বর্জ্যে নাভিশ্বাস বুড়িগঙ্গা

আবু তাহের খোকন

একসময়কার প্রমত্ত বুড়িগঙ্গা এখন যেন বিষের স্রোত বয়ে নিয়ে চলেছে। রাজধানী ঢাকার প্রাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ নদী দীর্ঘদিনের দূষণে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক-পলিথিন এবং নৌযান থেকে নির্গত তেল-রাসায়নিকের অব্যাহত দূষণে নদীর পানি হারিয়েছে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে কমে গেছে জলজ প্রাণীর বিচরণ। বুড়িগঙ্গার দুই তীর ও আশপাশে গড়ে ওঠা ডাইং, কেমিক্যাল, প্লাস্টিক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিয়ত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকলেও তা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে চালু রাখা হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন অভিযানে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলার ঘটনাও ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নগরের গৃহস্থালি বর্জ্য, মানববর্জ্য ও অপরিশোধিত স্যুয়ারেজ। প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীতে চলাচলকারী লঞ্চ, কার্গো ও টাগবোট থেকেও তেল, ডিজেল, গ্রিজসহ বিভিন্ন দূষিত পদার্থ পানিতে মিশছে। অনেক স্থানে পানির ওপর তৈরি হচ্ছে তেলের আস্তরণ। এতে পানিতে অক্সিজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জলজ প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। দীর্ঘদিনের দূষণের প্রভাব এখন শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ নেই; তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে। তীব্র দুর্গন্ধে অনেক এলাকায় স্বাভাবিক বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বুড়িগঙ্গার তলানিতে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা, তামা, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। এতে নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার নজরদারি ও প্রয়োগব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইটিপি অনলাইন মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দূষণপ্রবণ এলাকায় আইপি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত অভিযান এবং ইটিপি সার্বক্ষণিক সচল রয়েছে কি না, তা নজরদারির পরিকল্পনাও রয়েছে। বুড়িগঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পানির প্রবাহ বাড়ানো এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং কার্যক্রমের মাধ্যমে দূষিত পলি অপসারণ করে নাব্য ও প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। নদী পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তলদেশের পুরোনো দূষিত পদার্থ অপসারণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, পানির গুণগত মান উন্নয়ন, তীরে ইকো-বাফার জোন তৈরি, অবৈধ দখল ঠেকানো এবং জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘শিল্পগুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশ মেনে ইটিপি চালু করলে নদীর পানি এমন কালো থাকত না। এসব নির্দেশ শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ। নিয়মিত তদারকি না হলে ফল শূন্য।’ তিনি বলেন, ‘নদীগুলোর প্রকৃত অভিভাবক বলতে কিছু নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসন এবং ভূমি, আইন, পরিবেশ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়-সবাই নদীকে নিজের বলে দাবি করে। তবে নদী রক্ষার দায়িত্ব একে অন্যের ওপর চাপায়। কোনো সমন্বয় নেই। নদী রক্ষা কমিশনেরও সুপারিশ করা ছাড়া কোনো ক্ষমতা নেই। এমন কাঠামো ও সমন্বয়হীনতায় নদী রক্ষা সম্ভব নয়। নদী রক্ষায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে এবং যার ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights