ব্রাজিলের চ্যালেঞ্জ অদম্য মরক্কো

আবু নাঈম তরুণ

রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল শিরোপার স্বাদ পাচ্ছে না গত ২৪ বছর ধরে। এবারও বাজির দরে স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের চেয়ে পিছিয়ে সেলেকাওরা। বিশ্বকাপ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে ব্রাজিল অধিনায়ক ক্যাসিমিরোও এমনটা স্বীকার করেছেন। এই সেলেকাও সেনাপতি জানান, ফেবারিট না হওয়াতেই নিজেদের প্রমাণে আরও বেশি মুখিয়ে থাকবে তার দল। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ড্রয়ের পর থেকেই শুরু হয় চুলচেরা গ্রুপ বিশ্লেষণ। গ্রুপ ‘সি’ যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের কোলাজ। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, অন্যদিকে গত বিশ্বকাপের রূপকথা লিখে আসা আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কো। এদের সঙ্গে লড়তে আসছে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা লড়াকু স্কটল্যান্ড এবং ৫২ বছর পর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে আসা ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। শক্তির বিচারে যোজন যোজন ব্যবধান থাকলেও, গতি আর শৌর্যের এ গ্রুপে রোমাঞ্চের কোনো কমতি নেই।

গ্রুপ ‘সি’-এর দিকে তাকালে অবধারিতভাবেই প্রথম দুটি নাম আলাদা করে চোখে পড়বে, ব্রাজিল ও মরক্কো। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একমাত্র দল ব্রাজিল। কার্লো আনচেলত্তির জাদুকরী ছোঁয়ায় সেলেকাওরা এবার তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ শিরোপার খোঁজে নামবে। গতিশীল ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসা ভিনিসাস জুনিয়র আর গোল মুখের সামনে নির্মম রাফিনিয়াদের সামলানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই এক দুঃস্বপ্ন। সঙ্গে থাকবেন দীর্ঘদিন পর ফেরা ট্রাম্পকার্ড নেইমার। তবে ব্রাজিলিয়ান সাম্বার ছন্দ কাটার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে ১৯৭০ সালে অভিষিক্ত মরক্কো। কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে যারা ইতিহাস ওলটপালট করেছিল, সেই অ্যাটলাস লায়ন্সরা এবার আরও পরিপক্ব। রক্ষণ আর আক্রমণের সেতুবন্ধন তৈরিতে বিশ্বসেরাদের একজন আশরাফ হাকিমি। আর আক্রমণ ভাগে নতুন যোগ হওয়া ব্রহিম দিয়াজ মরক্কোর ফুটবলকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে ব্রাজিলকে তারা ছেড়ে কথা বলবে না, তা হলফ করেই বলা যায়।

কাগজে-কলমে ব্রাজিল ও মরক্কো এগিয়ে থাকলেও, গ্রুপ ‘সি’-এর ডার্ক হর্স বলা হচ্ছে স্কটল্যান্ডকে। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে তারা। ইউরোপীয় বাছাইপর্বের কঠিন বৈতরণী পার হয়ে আসা স্কটিশদের মূল শক্তি তাদের শারীরিক ফুটবল এবং মিডফিল্ডার স্কট ম্যাকটমিনের গোল করার সহজাত প্রবৃত্তি। অধিনায়ক অ্যান্ড্রু রবার্টসনের অভিজ্ঞতা দলটিকে যেকোনো বড় প্রতিপক্ষের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস জোগাবে। অন্যদিকে, এই গ্রুপের সবচেয়ে বড় ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ হাইতি। ১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ ৫২ বছরের খরা কাটিয়ে অবশেষে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই প্রতিনিধিরা। বিশ্বমঞ্চে হারানোর কিছু নেই তাদের, আর এই ‘হাল ছেড়ে না দেওয়া’ মানসিকতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বড় দলগুলোর পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ ওলটপালট করে দেওয়ার সব রকম বারুদ লুকিয়ে আছে এই আন্ডারডগ দলটির মধ্যে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, গ্রুপ ‘সি’ থেকে নকআউট পর্বের টিকিট পাওয়ার দৌড়ে ব্রাজিল ও মরক্কো অনেকটাই এগিয়ে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চ বরাবরই অঘটনের চারণভূমি। স্কটল্যান্ডের শৃঙ্খলা আর হাইতির আবেগের বিস্ফোরণ ঘটলে বদলে যেতে পারে সব হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের জোড়া জোড়া তারকা মাঠ মাতাবেন, নাকি মরক্কো আবার নতুন কোনো রূপকথা লিখবে তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights