ভালো নেই আইজুদ্দীন
মন্জুরুল ইসলাম
আশি ও নব্বইয়ের দশকের পুরো সময়টাতে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদের নানা স্লোগান ছিল। আশির দশকে এরশাদকে নিয়ে হয়েছিল ‘বিশ্ব বেহায়া’র কালজয়ী প্রতিবাদ। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রতিবাদী বক্তব্য ছিল- ‘কষ্টে আছি আইজুদ্দীন’। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় তখন ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে এ ছিল আইজুদ্দীনের প্রতিবাদ। ১৯৯৬-২০০১-এর পর দ্বিতীয় দফায় শেখ হাসিনা ১৫ বছর সাত মাস ক্ষমতায় ছিলেন। বর্তমান সময়ে এরশাদকে আর স্বৈরাচার বলতে ভালো লাগে না। কারণ গত ১৫ বছরের দুঃশাসনে এরশাদের স্বৈরাচারী ইমেজ অনেকটা ভোঁতা হয়ে গেছে। নয় বছরে এরশাদের সব কাজই খারাপ ছিল তা-ও কেউ বলবে না। উপজেলার মাধ্যমে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক তৈরিসহ অনেক কাজই সে সময় হয়েছে। কিন্তুÍ শত চেষ্টা করেও এরশাদ দেশবাসীর মন জয় করতে পারেননি। এর অন্যতম কারণ হলো, দেশবাসী মনে করেছিল এবং এখনো মনে করে যে, দেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাঁর হাত ছিল। জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর নানা ছলাকলায় বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদের নানা ছলাকলা ও প্রেমময় জীবনাচার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি দেশবাসী। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে ১৯ দফার রাজনীতি, মাটি-মানুষের খাল কাটার রাজনীতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতির জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া যেভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সে স্থানে শত চেষ্টায়ও প্রবেশ করতে পারেননি এরশাদ। আইজুদ্দীনরাও এরশাদকে গ্রহণ করেননি। কারণ তাঁদের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। আইজুদ্দীন ভোট দিতে পারেননি। আইজুদ্দীন কথা বলতে পারেননি। ডাল-ভাত খেয়ে আইজুদ্দীন তাঁর খাটুনির শরীর অনেক কষ্টে ঠিক রেখেছেন। কিন্তু মন ও বিবেককে খাবার দিতে পারেননি। আইজুদ্দীন ছিলেন মানসিকভাবে অতৃপ্ত। এরশাদ আমলের অতৃপ্ত আইজুদ্দীনের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে। সেজন্য আইজুদ্দীন প্রতিবাদের জমিন হিসেবে দেয়ালকে বেছে নিয়েছিলেন। সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে লিখেছিলেন তাঁর কষ্টের কথা- ‘কষ্টে আছি আইজুদ্দীন’। সে সময় সারা দেশে ঝড় তোলা এ প্রতিবাদ জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন এ আইজুদ্দীনকে নিয়ে।
হাসিনার ’৯৬-এর সরকারের পতনের পর আইজুদ্দীনের কষ্ট আরও বেড়েছে। কত কিছু যে মহান আল্লাহ তাঁকে দেখিয়েছেন তার ইয়ত্তা তিনি করতে পারেন না। দুরন্ত যৌবনের আশির দশক থেকে এখন তাঁর বয়সের খাতায় আরও দেড় কুড়ি বছর যোগ হয়েছে। চোখের জ্যোতিও কিছুটা কমে গেছে। শরীরে আগের মতো বল নেই। অনেক কিছুর হিসাব মেলাতে পারছেন না। গত ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে একজন নেত্রী পালিয়ে গেলেন। বারবারই নিজের মনে অঙ্ক কষেন আইজুদ্দীন, কীভাবে হলো জুলাই বিপ্লব, কীভাবে ৫ আগস্টের মতো একটা ঘটনা ঘটল। তার মনে হলো যেন আচানক একটা ঝড় সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল। এ দেশের তরুণরা, ছাত্ররা কীভাবে কী করে ফেলল তা তিনি আন্দাজ করতে পারছেন না। শুধু দেখলেন, যে নেত্রী জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে হত্যা করলেন, তাঁর পিতার হত্যাকারী অভিযোগে কিছু মানুষকে হত্যা করলেন, দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করলেন, তাঁর পুত্র এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশছাড়া করলেন, লাখ লাখ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হামলা-মামলা দিয়ে বাড়িঘর ছাড়া করলেন, আয়নাঘর করলেন; আরও কত কী করলেন! ১৫ বছরে দেশের দাড়ি-টুপিওয়ালা, হিজাব পরা মানুষ নিয়ে একের পর এক জঙ্গি নাটক সাজানো হলো। ভোট নিয়ে যা হলো তা তো ছিল বিশ্ব রেকর্ড। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খুব ইচ্ছা শেখ হাসিনার ছিল। নোবেল পুরস্কার এনে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাঁর বিশ্বস্ত কিছু অনুচর অবশ্য ভালোই টুপাইস কামিয়েছিলেন বলে দুর্মুখদের মুখে শোনা যায়। শত চেষ্টা করেও হলো না বলেই হয়তো নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি এতটা গোস্সা।
ভালো নেই আইজুদ্দীনএকটা স্বপ্ন নিয়ে ছাত্ররা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিল। আবু সাঈদরা রক্ত দিল। হাজারো মানুষ পঙ্গু হলো। কিন্তু কিছুতেই আইজুদ্দীন হিসাব মেলাতে পারছেন না। হায়াত-মউতের কথা বলা যায় না। রাতে শুইলে সকালেই হয়তো বিছানা থেকে আর উঠতে পারবেন না। কিন্তু হিসাব মেলাতে না পারলেও মেলাতে যে পারবেন না তা তিনি মনে করেন না। সে কারণে তিনি প্রতিজ্ঞ, হিসাব তাকে মেলাতেই হবে। খোদার কাছে যাওয়ার আগে যেন হিসাব মেলাতে পারেন সে দোয়াই সারাক্ষণ করছেন।
লেখাপড়া তেমন জানা নেই আইজুদ্দীনের। তার পরও মাঝেমধ্যে নিজেকে যথেষ্ট জ্ঞানী মনে হয়। নিজের জ্ঞানগরিমা নিয়ে কখনো কখনো নিজের মধ্যে আঁতেল আঁতেল ভাব চলে আসে। কারণ, প্রতিবাদের ভাষায় একদিন তাঁর নামটিও ছিল দেয়ালে দেয়ালে। সেসব দেয়াল থেকে তাঁর নাম মুছে অনেকের নামই পরে লেখা হয়েছে। ওই দেয়ালগুলোতে এখন আবু সাঈদ, মুগ্ধদের নাম। প্রতিবাদের হাজারো গ্রাফিতি। নিজের এবং আবু সাঈদদের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য খুঁজে পান না। কারণ তিনি মনে করেন, প্রতিবাদী বা বিপ্লবীদের নাম-চেহারা ভিন্ন হলেও তাঁদের ভাষা একই। একইভাবে, স্বৈরাচারদের চেহারা ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের কর্মকাণ্ডও থাকে একই। তাদের প্রতিপক্ষ থাকে শুধু দেশের জনগণ।
নব্বইয়ের দশকে আইজুদ্দীনের নাম যখন দেয়ালে শোভা পেত, এর আগে আশির দশকে এরশাদকে বলা হতো স্বৈরাচার। বিখ্যাত পটুয়া কামরুল হাসান এরশাদকে তাঁর তুলির আঁচড়ে ‘বিশ্ব বেহায়া’ হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে-দেশ ধ্বংস, গণতন্ত্র ধ্বংস, মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা রুদ্ধ করতে কে বেশি স্বৈরাচার-এরশাদ নাকি হাসিনা?
গত ৫৩ বছরে দেশ নিয়ে অনেকে অনেক কিছু করেছেন। কেউ ক্ষমতায় ছিলেন, কেউ ছিলেন রাজপথে। আইজুদ্দীনরা সব সময়ই রাজপথে ছিলেন। একেক সময় একেকটা ইস্যুতে রাজপথ গরম থাকত। এবারের গরমটা একটু বেশি ছিল। আর এ গরমের লক্ষ্য হলো বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র, সমাজ গড়ে তোলা। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগের ও পরের একটি স্লোগান আইজুদ্দীনের খুব মনে পড়ে। তা হলো- ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না’। সেই স্লোগান গত ৫৩ বছরেও বন্ধ হয়নি। আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দিনদিন বেড়েছে। এ বৈষম্য কমাতে সবাই শুধু মুখে মুখে অনেক ভারী ভারী কথা বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে কেউই তা দূর করার চেষ্টা করেননি। জুলাই বিপ্লবের পর আইজুদ্দীন একটু আশার আলো দেখেছিলেন যে, হয়তো এবার তাঁর ইচ্ছা পূরণ হবে। দেশের সম্মানিত ব্যক্তিরা হয়তো তাঁদের সম্মান ফিরে পাবেন। দেশটা হয়তো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী হবে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। দেশের শিল্পপতিরা হয়তো বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে তুলবেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে আবার হতাশ হচ্ছেন আইজুদ্দীন। তিনি হিসাব মেলাতে পারছেন না। তাঁর স্বশিক্ষার জ্ঞানে মনে করেন, দেশে বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হলে সবার আগে দরকার সামাজিক শান্তি। কিন্তু গত ছয় মাসে তিনি সেটা কোথাও খুঁজে পাননি। বরং নানা রকম অন্যায়-অপরাধ এখন বাড়ছে। মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় গলায় কাঁটা বিঁধলে যেমন অস্থির লাগে, এখন সে রকম অস্থিরতা সব ক্ষেত্রে লক্ষ করছেন আইজুদ্দীন। দেশের আইনশৃঙ্খলা এলোমেলো মনে হচ্ছে। অনেক বেশি স্বাধীনতা পেয়ে রিকশাওয়ালাও এখন পুলিশকে ধমকান! কথা বলতে পারে না পুলিশ। কারণ সে অপরাধী। যেসব ব্যবসায়ী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সৎভাবে ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের চেয়ে মাদক কারবারি, চাঁদাবাজরা অল্প সময়ে ধনী হয়ে যাচ্ছেন। সবখানে শুধু খাই খাই পার্টি। আইজুদ্দীন এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে যান। তখন ঘরের কোণে রাখা নারকেল তেলের শিশি থেকে এক আঁজলা তেল নিয়ে মাথার তালুতে ঘষেন। তেল দিয়ে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। কারণ, তাঁর ভাবনার সঙ্গে মিলছে না কোনো কিছুই। সামান্য জ্ঞানে আইজুদ্দীন মনে করেন দেশটা ভালো রাখতে হলে, বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়তে হলে সামাজিক শান্তি লাগবে। সামাজিক শান্তির জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা ঠিক থাকতে হবে। এ দুটি বিষয় ঠিক থাকলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো হবে। রাজনীতি যদি দেশের জনগণের জন্য হয় তাহলে দেশে শান্তি ফিরে আসবে। তখনই দেশের সাধারণ মানুষ সুখে থাকবে। আর তখনই দেশে নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে। অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। বেকারত্ব কমবে। মাদকের কারবার কমবে। আমাদের নারী ও শিশুরা মুক্তবিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াবে। স্বাধীনভাবে চলতে পারবে। মুক্তচিন্তা করতে পারবে। আমাদের যুবকরা হবে আত্মনির্ভরশীল। বিদেশিরাও আমাদের এ সোনার দেশে আসবে। সারা পৃথিবী এ দেশের নামটা নতুন করে নতুন মর্যাদায় জানবে। আবু সাঈদের রক্তের সম্মান থাকবে, গর্বে আমাদের বুকটা ভরে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে আইজুদ্দীনের দুই চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। চোখের কোণ ভিজে যায়। মনের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। প্রতিবাদী দেয়ালগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই সঙ্গে বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, ‘আইজুদ্দীন তুমি ভালো নেই।’
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
