ভূরুঙ্গামারীতে খোরপোষ আদায়ে প্রতারণার আশ্রয়ের অভিযোও দ্বৈত কাবিনের অভিযোগে বিতর্ক গ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ১১.০৭.২০২৬
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে তথ্য গোপন করে একই ব্যক্তির নামে একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি, একই বিবাহের একাধিক কাবিননামা প্রস্তুত এবং পূর্ব স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে খোরপোষ ও দেনমোহরের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বকেদার গ্রামে। অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালের ৩ আগস্ট পূর্বকেদার গ্রামের মৃত ছকিয়তুল্লাহর মেয়ে মোছা. রাশেদা বেগমের সঙ্গে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের ইন্দ্রগড় ব্যাপারীটারী এলাকার মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. মিজানুর রহমানের ২৯ হাজার ৯৯৯ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই বিয়ে নিবন্ধন করেন কথিত ভুয়া কাজী আব্দুল হক।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পরে পারিবারিক কলহের জেরে উভয় পক্ষের সম্মতিতে ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর ৩১ হাজার টাকা দেনমোহর ও খোরপোষ পরিশোধের মাধ্যমে খোলা তালাক সম্পন্ন হয়।
তবে অভিযোগে বলা হয়েছে, তালাকের পর রাশেদা বেগম ও তার স্বজনরা টাকা গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে কথিত ভুয়া কাজী আব্দুল হকের সহযোগিতায় আগের ২৯ হাজার ৯৯৯ টাকার কাবিননামার পরিবর্তে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৯ টাকা দেনমোহর উল্লেখ করে নতুন একটি কাবিননামা তৈরি করেন। পরে ওই কাবিননামার ভিত্তিতে আদালতে মামলা করে পূর্ব স্বামীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, যৌতুক ও অন্যান্য অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলা বিচারিক পর্যায়ে খারিজ বা খালাস হয়। তবে দেনমোহর সংক্রান্ত মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল এবং পরে উচ্চ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, কথিত ভুয়া কাজী আব্দুল হক নিজেকে বলদিয়া, শিলখুড়ি ও পাইকেরছড়া ইউনিয়নের বিবাহ নিবন্ধক হিসেবে পরিচয় দিলেও তার বৈধ লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভুয়া বিবাহ নিবন্ধন ও জাল কাবিননামা তৈরির অভিযোগে অতীতে তার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা হয়েছে। তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগও করেছেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে এখনও কয়েকটি মামলা আদালতে বিচারাধীন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, খোলা তালাকের পর রাশেদা বেগম ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের গয়বাড়ী বানুরকুটি গ্রামের নুরু মিয়ার ছেলে সাইদুল ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বর্তমানে সংসার করছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য আহেদ আলী, প্রতিবেশী মফিজুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, রাশেদা বেগম সাইদুল ইসলামের তৃতীয় স্ত্রী এবং তাদের ঘরে মিথিলা খাতুন নামে প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, পূর্বের জাতীয় পরিচয়পত্র বহাল থাকা অবস্থায় তথ্য গোপন করে ভিন্ন নাম, ভিন্ন জন্মতারিখ ও ভিন্ন ঠিকানায় আরেকটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি এনআইডিতে তার নাম মোছা. রাশেদা বেগম, অন্যটিতে মোছা. রাবেয়া বাসরী উল্লেখ রয়েছে।
রাশেদা বেগমের মা মোছা. হনুফা বেগম জানান, তার মেয়ের প্রথমে মিজানুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। পরে তালাকের পর সাইদুল ইসলামকে বিয়ে করে বর্তমানে তার সঙ্গেই সংসার করছেন এবং তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
ভুক্তভোগী পূর্ব স্বামী মো. মিজানুর রহমান বলেন, “২০১১ সালে উভয় পক্ষের সম্মতিতে তালাক এবং খোরপোষের টাকা পরিশোধ করেছি। এরপরও আমাকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও মানসিকভাবে হয়রানি করতে জাল কাবিননামা ও বিভিন্ন মামলা ব্যবহার করেছে। আমি আদালতের ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখছি। চূড়ান্ত রায়ের পর আইনের আশ্রয় নেব।”
বলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক ব্যাপারী বলেন, “রাশেদার প্রথমে কচাকাটায় বিয়ে হয়েছিল। পরে তালাক হওয়ার পর সোনাহাট এলাকায় আবার বিয়ে হয়েছে বলে শুনেছি।” প্রতিবেশী মফিজুল ইসলাম বলেন, “সাইদুল ইসলামের সঙ্গে রাশেদা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের একটি মেয়ে সন্তানও রয়েছে। তবে বিয়ে নিবন্ধন হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।”
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত রাশেদা বেগম, তার বর্তমান স্বামী সাইদুল ইসলাম এবং অভিযুক্ত কাজী আব্দুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার, জাল কাবিননামা তৈরি এবং আদালতে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশন, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
