ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ দৃশ্য
প্রতিদিন ডেস্ক
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় জাতীয় ছুটির দিনে পর পর দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোর ৪টা ৪ মিনিটে) প্রথম দফায় ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প ইয়ারাকুই রাজ্যে উৎপন্ন হয়, যার গভীরতা ছিল মাটির নিচে ২১ দশমিক ৯ কিলোমিটার।
এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আঘাত হানা ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ইউমারে শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং এর গভীরতা ছিল ভূগর্ভের মাত্র ১০ কিলোমিটার।
এ ভূমিকম্পের ফলে অগণিত ভবন ধসে পড়েছে এবং গতকাল সন্ধ্যারাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, এসব ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েক শ মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার পর আফটারশক আতঙ্কে হাজার হাজার মানুষ বাড়ির বাইরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে। মার্কিন ভূবিজ্ঞানী বা ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ দুর্যোগে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা ৪৪ শতাংশ এবং মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৩০ শতাংশ। সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরা, এএফপি
ভূমিকম্পের পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ভয়াবহ এ জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটির জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জরুরি সহায়তার বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। এ চরম দুর্যোগে এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলার জন্য সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, চীনসহ নানান দেশ।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, দেশটির ইতিহাসে ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি। এ ভূমিকম্প কেন্দ্র করে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার ১২ ঘণ্টা পর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৬৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় পর্যন্ত নিখোঁজ ছিল হাজার হাজার মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে রাতের অন্ধকারেও অভিযান চালিয়েছেন।
আরেক খবর অনুযায়ী, রাজধানী কারাকাসে ভূমিকম্পের পর বহু ভবন ধসে পড়েছে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ সাহায্যের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো বলেন, ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার একাধিক অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রুহিয়ো, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা, কারাকাস ও লা গুইরায় এটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসে পালোস গ্রান্দেস ও আলতামিরা এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তদারকির জন্য তিনি একজন জেনারেলকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা আপাতত বন্ধ থাকবে। এ সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত থাকবে। তাঁর ভাষণে তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সর্বোপরি ঐক্যের আহ্বান জানান। আরও জানানো হয়, কারাকাসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মাইকুয়েতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছাদের একাংশ ধসে পড়ায় সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এদিকে ভূমিকম্পের সময় নিজের ভবন থেকে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন রবার্তো গামাস নামে এক বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘ভবনটি এক পাশ থেকে আরেক পাশে দুলছিল। দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য। সৌভাগ্যক্রমে ভবনটিতে তখন খুব বেশি মানুষ ছিল না। কিন্তু ভাবুন তো, যদি অনেক মানুষ থাকত তাহলে সবাই বের হওয়ার চেষ্টা করলে কী ধরনের আতঙ্ক তৈরি হতো!’ ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, এটি তাঁর জীবনের অনুভূত সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন ছিল এবং সাত তলার ফ্ল্যাটে থাকার সময় তীব্র ঝাঁকুনিতে তাঁর মনে হয়েছিল পুরো ভবনটি বুঝি তাঁর গায়ের ওপর ভেঙে পড়বে। সূত্র জানান, ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে ঝুঁকি নিয়ে তল্লাশি চালান। অন্ধকারের মধ্যে তাঁরা ভেঙে পড়া স্থাপনার ওপর উঠে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন এবং ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারে কাজ করেন। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, দুলতে থাকা কাচের আলমারিতে রাখা চীনামাটির জিনিসপত্র ধরে রাখার চেষ্টা করছেন দুই ব্যক্তি, কিন্তু সেগুলো মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এ ভূমিকম্পটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী। ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবর উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত ভেনেজুয়েলায় এমন শক্তিশালী কম্পন দেশটির অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর পরবর্তী সময়ে আরও আফটারশক বা পরাঘাতের আশঙ্কা থাকে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি। সূত্র আরও জানান, ভূমিকম্পের তীব্রতার কারণে পার্বত্যাঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিধস এবং সমতলে মাটির তারল্য বা লিকুইফেকশন হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। ভেনেজুয়েলার মন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ভিটিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেন শক্তিশালী এ ভূমিকম্পের কারণে রাজধানী কারাকাসের বহুতল ভবন ভেঙে পড়েছে।
মন্ত্রী জানান, কারাকাস ছাড়াও দেশের ত্রুহিলিও, ইয়ারাকুই, কারাবোবো, আরাগুয়া, মিরান্দা ও লা গুয়াইরা রাজ্য এ ভূমিকম্পে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, শহরের অসংখ্য বাড়িঘরে বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে এবং কিছু ভবন সম্পূর্ণ ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একজন সাংবাদিকের পাঠানো ছবিতে কারাকাস শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখা গেছে। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে শত শত কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায়ও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে এবং সতর্কতাস্বরূপ সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পের এ ঘটনাটি ভেনেজুয়েলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ছুটির দিনে ঘটেছে। দেশটির স্বাধীনতাসংগ্রামী নেতা সিমন বলিভার কর্তৃক স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ১৮২১ সালের ঐতিহাসিক কারাবোবো যুদ্ধের বিজয়ের স্মরণে এদিন দেশটিতে সাধারণ ছুটি ছিল। ফলে অন্য যেকোনো কর্মদিবসের তুলনায় সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ সপরিবার নিজেদের ঘরবাড়িতে অবস্থান করছিল।
বিশ্বনেতাদের সহায়তা ঘোষণা : সমাজমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এ ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলায় একটি ধ্বংসাত্মক মৃত্যুযজ্ঞ রেখে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ সংকটে ভেনেজুয়েলাকে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ইচ্ছুক ও সক্ষম।’ এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, তারা এরই মধ্যে একটি দুর্যোগ সহায়তা দল ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। প্রথম দিন থেকেই ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী এবং অন্যান্য জরুরি সম্পদ দেশটিতে পাঠানো হচ্ছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডি সিলভা জানান, তাঁর সরকার কারাকাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় উদ্ধারকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে। তিনি জানান, ৫০ টন আধুনিক সরঞ্জাম, ওষুধ, প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ ৩০০ জন অভিজ্ঞ উদ্ধারকারী ও প্যারামেডিক কারাকাসে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। রাজনৈতিক ও আদর্শিক বৈরিতা ভুলে ভেনেজুয়েলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আর্জেন্টিনাও। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, তাঁর দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শিনবাউমও জানান, তাঁরা বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসক দল নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া বার্তায় ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘গত রাতের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর আমরা সব ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দুর্গতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ দেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানান, বেইজিং ভেনেজুয়েলাকে তাদের সাধ্যমতো যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহের সংস্থার (ওএএস) মহাসচিব আলবার্ট রামদিন পানামায় সমাবেশে বলেন, ‘এখনো অনেক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি, তবে এই কঠিন সময়ে ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে দাঁড়াতে পুরো দেশ প্রস্তুত।’ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ভেনেজুয়েলার মানুষের প্রতি তাঁর ও তাঁর দেশের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তিনি নিহতদের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনাও জানান। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, বলিভিয়ার জনগণের ‘হৃদয় ও প্রার্থনা ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে রয়েছে। বলিভিয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভেনেজুয়েলাকে যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’ উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ নাগরিকের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেছেন। ভেনেজুয়েলা যেভাবে প্রয়োজন মনে করবে, সেভাবেই তাঁরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
