ভেনেজুয়েলার তেলে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ, ট্রাম্পের চুক্তির নেপথ্যে আসলে কী?
অনলাইন ডেস্ক
অন্য দেশের তেলসম্পদ দখলের আকাঙ্ক্ষা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুদিনের। এবার ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর করা এই চুক্তি আইনি ও বাস্তবায়নগত নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। চুক্তির কাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থার ক্ষমতা এবং ভেনেজুয়েলার তেল আইনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তির কেন্দ্রে থাকা ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেজের অতীত নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও তদন্ত।
আগস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পেন্টাগনের অধীন কৌশলগত মূলধন দফতর বা অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটাল (ওএসসি) ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (এনএবিইপি) ৩৫ শতাংশ মালিকানা নেবে। চুক্তির আওতায় বিপুল পরিমাণ ভেনেজুয়েলান তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তৈরি হবে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবে এবং দেশটির তেল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু চুক্তির প্রকৃত কাঠামো নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব নথি ও বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
তেল দখলের চিন্তা ট্রাম্পের বহুদিনের
অন্য দেশের তেলসম্পদ দখলের ধারণা ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। ১৯৮৭ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন জাহাজে ইরানি হামলার প্রসঙ্গে এবিসির বারবারা ওয়াল্টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা ইরানের কিছু তেলক্ষেত্র যুক্তরাষ্ট্র কেন দখল করে নেয় না।
পরবর্তী কয়েক দশকেও সামরিক সংঘাতের পর অন্য দেশের তেলসম্পদ দখল বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ধারণার কথা ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। ইরান থেকে লিবিয়া ও ইরাক- বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রেই এমন বক্তব্য এসেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার পর সেই পুরোনো ধারণা বাস্তব রূপ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে।
এরপর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের আওতায় আনার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসে। জানুয়ারিতেই ট্রাম্প মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
চুক্তির কেন্দ্রে বেতানকুর্ত
পুরো চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেজ। ৪৬ বছর বয়সী এই ভেনেজুয়েলান ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন। স্পেন, যুক্তরাজ্য ও নিউইয়র্কে তার বাড়ি রয়েছে। ভেনেজুয়েলার জ্বালানি ও তেল ব্যবসায় তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি সানগ্লাসের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানিকে নিজের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন।
বেতানকুর্তের ব্যবসায়িক ইতিহাস যেমন আলোচিত, তেমনি বিতর্কিতও। ভেনেজুয়েলার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে বিভিন্ন সময়ে তার বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। তবে তিনি কোনও অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হননি। তার আইনজীবীও সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতানকুর্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-সংক্রান্ত অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে তদন্তের আওতায় এসেছিলেন, তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির অংশ হলো?
চুক্তির শুরুটা ছিল মূলত বেতানকুর্তের মালিকানাধীন এনএবিইপি-কে ঘিরে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি আর্থিক অংশীদারত্ব তৈরি করা, যা অন্য বিনিয়োগকারীদেরও আশ্বস্ত করবে।
হোয়াইট হাউস ও প্রতিরক্ষা দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এনএবিইপি-এর ৩৫ শতাংশ মালিকানা পেয়েছে। তবে পেন্টাগনের কংগ্রেসকে দেওয়া লিখিত ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ‘ওয়ারেন্ট’- অর্থাৎ ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট শর্তে কোম্পানির শেয়ার কেনার অধিকার; সরাসরি শেয়ার নয়।
রয়টার্সও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ‘পেনি ওয়ারেন্ট’ হিসেবে কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে এনএবিইপি নতুন মূলধন সংগ্রহ করলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব যাতে কমে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মাধ্যমে এনএবিইপি-এর উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদনমূল্যে কেনার অধিকার যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে করদাতাদের অর্থ ব্যয় না করেই ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ’ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পেন্টাগনের তেল কোম্পানির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো- পেন্টাগন আদৌ কোনও বিদেশি বেসরকারি তেল কোম্পানির মালিকানা নিতে পারে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কৌশলগত মূলধন দফতরকে সরাসরি বেসরকারি কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক অ্যাশলি ডিকসের মতে, কংগ্রেস ওএসসি-কে ইকুইটি বিনিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে- এমনটা মনে করার মতো স্পষ্ট ভিত্তি নেই।
পেন্টাগন অবশ্য জানিয়েছে, ওএসসি সরাসরি কোনও বেসরকারি কোম্পানিতে ইকুইটি অংশীদারত্ব নেয় না।
পেন্টাগনের সাবেক এক কর্মকর্তার দাবি, এনএবিইপি-এ যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব অন্য একটি দফতর- ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস অ্যানালাইসিস অ্যান্ড সাসটেইনমেন্ট বা আইবিএএস-এর মাধ্যমে রাখা হচ্ছে। কিন্তু ওই দফতরের মূল কাজ তেল ব্যবসা নয়; তাদের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এই সাংগঠনিক অসামঞ্জস্যই চুক্তির আইনি কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
১০০ বছরের চুক্তি নিয়ে বিতর্ক
চুক্তিটির মেয়াদ নিয়েও প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার আইনের সম্ভাব্য সংঘাত রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি- কোথাও ১০০ বছর পর্যন্ত অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার আইন বিশেষজ্ঞ হোসে ইগনাসিও হার্নান্দেসের মতে, দেশটির আইন অনুযায়ী তেল উন্নয়নের কোনও চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রশাসনের ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় এবং এটিকে ‘প্রচারমূলক বক্তব্য’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
এদিকে ভেনেজুয়েলার সরকারও চুক্তিটির মেয়াদ ১০০ বছর নয়, ২৫ বছর বলে জানিয়েছে। ফলে চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এখনই যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত ভরবে না
ট্রাম্পের আরেকটি দাবি হলো, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণ করতে পারবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এমনটি দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো বহু বছর ধরে অবহেলা ও সংকটে রয়েছে। নতুন করে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনের জন্য প্রয়োজন হবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, নতুন অবকাঠামো এবং সময়।
এ কারণেই তেলশিল্পের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও এর বড় ধরনের উৎপাদন বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুতে তার প্রভাব পড়তে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
এনএবিইপি অবশ্য বলছে, দুই বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। কোম্পানিটি ইতোমধ্যে নতুন কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত রিগ সংগ্রহ করেছে বলেও জানিয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা কেন সতর্ক?
চুক্তির কাঠামো, বেতানকুর্তের অতীত এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ- সব মিলিয়ে বড় তেল কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ভেনেজুয়েলা-বিষয়ক বিশ্লেষক ফিল গানসন বলেন, বড় বিনিয়োগকারীরা চুক্তিটির ‘অস্বচ্ছতা’, শর্ত এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এর সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক ঝুঁকিও। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বদলে গেলে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ কী হবে- সেটিও বড় প্রশ্ন।
তেল অর্থনীতিবিদ এড হার্সের মতে, বেতানকুর্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে তদন্তের ইতিহাস থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ তার সঙ্গে বড় আকারের বিনিয়োগে যেতে অস্বস্তি বোধ করতে পারে।
বেতানকুর্তের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ
বেতানকুর্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের ইতিহাস এক দশকেরও বেশি পুরোনো।
২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অটো রাইখ নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। ডারউইক অ্যাসোসিয়েটস নামের প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে বেতানকুর্ত সরকারি চুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন- এমন অভিযোগ করা হয়েছিল।
তবে আদালত রাইখের ‘র্যাকেটিয়ারিং’ বা সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ করেনি এবং মানহানির দাবিও এখতিয়ারগত কারণে খারিজ হয়।
বেতানকুর্তের আইনজীবী ভেল ফ্রিডম্যান ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া চিঠিতে বলেন, বেতানকুর্ত বা ডারউইক কখনও কাউকে ঘুষ দিতে বলেননি, নির্দেশ দেননি বা উৎসাহিত করেননি।
২০১৮ সালে বেতানকুর্তের এক চাচাতো ভাই ও ব্যবসায়িক অংশীদারের বিরুদ্ধে মায়ামিতে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচারের মামলা হয়। মামলার নথিতে বেতানকুর্তের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও মায়ামি হেরাল্ড তাকে মামলার এক অজ্ঞাত ‘সহযোগী’ হিসেবে শনাক্ত করেছিল বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেতানকুর্তের আইনজীবী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি এবং তাকে কখনও আসামি করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলা সরকারও একসময় তার অর্থের উৎস খুঁজেছিল
বেতানকুর্তকে ঘিরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, ভেনেজুয়েলার বর্তমান ক্ষমতাসীন মহলের কর্মকর্তারাই একসময় তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে তদন্তকারী ও হ্যাকার নিয়োগ করেছিলেন বলে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা তার অর্থের গতিপথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপ, হিসাবরক্ষক ও আইনজীবীদের তথ্যেও প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে।
বেতানকুর্তের আইনজীবী ওই হ্যাকিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তবে তিনি বলেন, বেতানকুর্ত তখন যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী বিরোধী সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ছিলেন। ফলে কোনও হ্যাকিং হয়ে থাকলে সেটিকে তার মাদুরো সরকারের বিরোধিতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
মাদুরোকে আটকের পর বেতানকুর্তের গুরুত্ব বাড়ে
২০২৪ সালের মধ্যে বেতানকুর্ত আবার ভেনেজুয়েলার তেল খাতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এনএবিইপি-এর মাধ্যমে তিনি দেশটিতে তেল উত্তোলন শুরু করেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনের পুলিশ অর্থ পাচারের তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনায় তার স্পেনের প্রাসাদে অভিযান চালায় বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে তার আইনজীবী জানিয়েছেন, ওই তদন্তে বেতানকুর্তের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে আটকের সময় বেতানকুর্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য।
তার আইনজীবীর মতে, দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থার কোনও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। উভয় পক্ষই বেতানকুর্তকে চিনত এবং তার ওপর নির্ভর করতে প্রস্তুত ছিল। ফলে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতানকুর্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের ভেনেজুয়েলার তেল নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনের চেষ্টা করা জাহাজ শনাক্ত করতেও তথ্য দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি-নাকি বড় ঝুঁকি?
ট্রাম্পের ভাষায়, এটি ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’। জাতিসংঘে দেওয়া সাম্প্রতিক ভাষণেও তিনি ভেনেজুয়েলার তেল চুক্তিকে যুদ্ধের বিজয়ের সুফল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু চুক্তিটির আইনি ভিত্তি, মার্কিন সরকারি সংস্থার মালিকানা নেওয়ার ক্ষমতা, ভেনেজুয়েলার তেল আইনের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং বেতানকুর্তের অতীত- সব মিলিয়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, এনএবিইপি-কে ১৪টি অতিরিক্ত তেলক্ষেত্রের অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল মজুতের ওপর কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্বের পাশাপাশি উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদনমূল্যে কেনার অধিকার পাবে।
অন্যদিকে চুক্তির সমালোচকেরা বলছেন, বিপুল মজুতের মালিকানা বা অধিকার পাওয়া আর সেই তেল দ্রুত উত্তোলন ও বাজারজাত করা এক বিষয় নয়। প্রয়োজন হবে বিপুল মূলধন, অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক ও আইনি স্থিতিশীলতা।
এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে চুক্তিটির আইনি বৈধতা, বিনিয়োগ সংগ্রহ, উৎপাদন অবকাঠামো এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর। ইতোমধ্যেই চুক্তিটির বিভিন্ন দিক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার আইন, তেলশিল্প এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
