মন্ত্রিপরিষদে ক্ষমতা দুর্নীতির ওরা পাঁচজন

ওয়াজেদ হীরা

ওরা পাঁচজনের সবাই সরকারি কর্মচারী। বছরের পর বছর বেতনের টাকায় হাত না দিয়ে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। তাদেরই একজনকে বিগত ২০ বছরের বেশি সময়েও বেতনের টাকায় হাত দিতে হয়নি। ইতোমধ্যে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পদোন্নতি পেয়েছেন। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একটি শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। কিছু কর্মকর্তাকে সুবিধা দিয়ে গড়ে তুলেছেন ক্ষমতা-দুর্নীতির সিন্ডিকেট। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এদের ক্ষমতা-দুর্নীতির ‘দিকপাল’ বলা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আসেন, চলে যান, বিভিন্ন কর্মকর্তা রদবদল হয় কিন্তুÍ তারা বহাল তবিয়তে সব সামলে নিয়ে মেতে ওঠেন নতুন পরিকল্পনায়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুুর রশীদ বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির বিষয়টি জেনেছি। এখানে কারও কোনো অনিয়ম থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন কর্মচারী বেতন ছাড়া কীভাবে চলেছে সেটিও খোঁজ নেব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১০-২০ গ্রেডের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী ২১৫ জন। অথচ পাঁচ দিকপালের কাছে বাকিরা অসহায় হয়ে দিন পার করছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী প্রটোকল অফিসার মো. ইমদাদুল ইসলাম। তিনি ১৯৯১ সালে ৯ এপ্রিল তৃতীয় শ্রেণির পদ সাঁটমুদ্রাক্ষরিক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বরে ব্যক্তিগত কর্মকর্তার পদোন্নতি পান। চাকরিতে যোগ দিয়ে কিছু দিন বেতন উত্তোলন করলেও ১৯৯২ সাল থেকে বেতন না তুলে সব টাকা তার সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলে (জিপিএফ ফান্ড) জমা করে দেন। ২০১৫ সালে নতুন পে-স্কেল করার পর সরকার নিয়ম করে দেয় একজন কর্মচারী মূল বেতনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি জিপিএফ ফান্ডে জমা করতে পারবে না। ২০১৫ সালের আগে সুনির্দিষ্ট না থাকার সুযোগ নিয়ে পুরো বেতনের টাকা জমা করে দিতেন জিপিএফ ফান্ডে। সেই টাকা সুদাসলে দাঁড়িয়েছে ১ কোটিতে। বেতন না তুলে পুরো টাকা কিভাবে জমা করল সেটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে যেখানে একজন সচিব/সিনিয়র সচিব অবসরে গেলে সর্বোচ্চ ৯৫ লাখ টাকা জিপিএফে জমা হচ্ছে। সেখানে এই কর্মচারীর জমা কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ে নানা কথাবার্তা ছড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন মানুষ বছরের পর বছর বেতন না তুলে কীভাবে সংসার চালিয়েছেন। নথি দেখে মন্ত্রিপরিষদের হিসাব শাখার কর্মকতারা এটিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। মহা হিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা আবদুল হাকিম তাহমী জানান, আমার অভিজ্ঞতায় দেখছি, যারা সচিব হিসেবে অবসরে যাচ্ছেন তাদের ভবিষ্যৎ তহবিলে সর্বোচ্চ কোটি টাকার কাছাকাছি জমা হয়েছে। কিন্তু নিচের গ্রেডের কারও এত টাকা জমা হয়েছে তা আমি দেখিনি। হওয়ার কথাও নয়। কোনো কর্মচারীর এমন অস্বাভাবিক জিপিএফ হলে সেটা বিরাট প্রশ্নের বিষয়।
মন্ত্রিপরিষদ সূত্রগুলো জানায়, ইমদাদুল ইসলাম ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতির পর প্রেষণে কাজ করছেন এক যুগের বেশি। অথচ সরকারি চাকরি বিধিমালায় তিন বছর পর পর অনত্র বদলির নিয়ম রয়েছে। তিনি প্রটোকল শাখায় কাজ করে সেবা শাখার পরিবহন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বেশি। মূলত প্রটোকল অফিসার হলেও কখনো তিনি এই কাজ করেন না। কোনো ভিআইপির যাতায়াত হলে তখন তিনি বিমানবন্দরে যাতায়াত করেন। এ ছাড়া গাড়ির দেখভালেই ব্যস্ত থাকেন। মন্ত্রিপরিষদের সব গাড়ির মেইনটেইন, জ্বালানির দায়িত্ব যেন তার আলাদিনের চেরাগ। নামে-বেনামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জমি কেনাসহ গুলশান, ধানমন্ডি ও মিরপুরে কয়েকটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তিনি সরকারি বাসা কমলাপুরে বসবাস করেন। তারই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য সচিবের দপ্তরের নেছারুল হাসান (পিও) ২৫ বছর ধরে একই জায়গায় আছেন। আবদুল্লাহ আল মামুন (পিও) ১৫ বছর ধরে, আশিকুর রহমান খান সহকারী সচিব হয়েও অফিস সহকারী পদে বসে আছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। সাধারণ সেবা শাখায় মো. আব্দুল আলীম অফিস সহকারী হিসেবে প্রবেশ করে এখন সহকারী সচিব। ২৫ বছর একই শাখায় রয়েছেন। কোনো অভিযোগ উঠলে সচিবের দপ্তর থেকে এসব অভিযোগপত্র গায়েব করে দেন এই সিন্ডিকেটের কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিয়ে সখ্যতা গড়ে তুলে মন্ত্রিসভা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রশাসন শাখার যুগ্ম সচিব মো. মাজেদুর রহমান খান। আরও কয়েক কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে আঁকরে বসেছেন বিভিন্ন শাখায়।

সূত্র আরও জানায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিন্ডিকেটের মূল হোতা প্রটোকল অফিসার ইমদাদুল ইসলাম, একই জায়গায় ২১ বছর ধরে চাকরি করার সুবাদে রাজত্ব ও দুর্নীতি কায়েম করে আসছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) একাধিকবার প্রটোকল অফিসার নিয়োগের পত্র দিলে তারা নিজস্ব প্রদ্ধতিতে নিয়োগের কথা বলেছেন। তবে সেটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। নিজে দীর্ঘদিন প্রেষণে প্রটোকল অফিসার থাকলেও অবৈধভাবে আরও তিনজন কর্মকর্তাকে বিকল্প প্রটোকল অফিসার হিসেবে পত্র জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে এক কর্মকর্তা তার আদেশ বাতিল করেছেন। এখনো আবু বকর সিদ্দিক ও মোহাইমিনুল ইসলামকে বিকল্প প্রটোকল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া আছে। কার্যত তাদের কাজ নেই। এই আদেশ জারির পেছনে হাত রয়েছে কতিপয় কর্মকর্তার। এই ধরনের আদেশ জারির সরকারি কোনো বিধিও নেই। প্রশাসন শাখার যুগ্ম সচিব মো. মাজেদুর রহমান খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব আদেশ করা যায় কিনা আমার জানা নেই। যদিও মন্ত্রিপরিষদের অন্য কর্মকর্তারা বলেন, কেউ অসুস্থ হলে বা অনুপস্থিত থাকলে কাজ চালানোর জন্য করা হয়ে থাকে। তবে নিয়ম নেই সেটিও জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।

মন্ত্রিপরিষদের সূত্রগুলো জানায়, বাজারের সর্বনিম্ন মানের মালামাল ক্যাবিনেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে সরবরাহ করেন ওই সিন্ডিকেট। বিষয়টি অনেকেই জানেন। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সেবা শাখার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বর্তমানে সহকারী সচিব আব্দুল আলীমের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে দপ্তরের টাকা হাতিয়ে নেন বলে জানা গেছে। এমদাদুল তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গড়েছেন রাজকীয় সব স্থাপনা। একাধিক সূত্র জানায়, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে কয়েক লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের নামে ঢাকায় সাতটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এগুলো হচ্ছে ঢাকা মিরপুর-১ এর শাহআলী মার্কেটের পাশে চারটি, মতিঝিলে একটি, গুলশান-১ নম্বর ও ধানমন্ডিতে রয়েছে একটি ফ্ল্যাট। যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে করদাতার আয় বিবরণীতে তিনি দেখাননি। তবে আয়কর বিবরণীতে তার মায়ের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর কাছে থেকে ১১ লাখ টাকা ধার হিসেবে দেখিয়েছেন। জানা গেছে, স্ত্রী এবং মা দুজনই গৃহিণী। তাদের কোনো আয় নেই। মায়ের নামে যে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) দেখিয়েছেন সেটি তার নিজের টিআইএন নম্বর। এ ছাড়া পরিবহন শাখা দেখার কারণে মতিঝিল ও পরীবাগের দুটি ফিলিং স্টেশন থেকে তেলের ভুয়া ভাউচার দিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মচারী ইমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘কারও বেশি টাকা-পয়সা হলে যে করতে পারেনি তার জ্বলে। আমি এক সময় বেশি টাকা জিপিএফে জমা করেছি এটা সত্য। তবে বেতন একেবারে ওঠাইনি এটা সঠিক নয়। চাকরির পাশাপাশি নানা কাজও করতাম। এটি হয়তো অনেকে হিংসে করতে পারে। যে কেউ এসব বলতেই পারে। ঢাকায় নিজের এবং স্বজনদের নামে তারই সাতটি ফ্ল্যাট থাকার বিষয়ে বলেন, আমার স্বজনদের নামে ফ্ল্যাট থাকতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক নয়। প্রায় ৩৫ বছর ধরে চাকরি করছি, এত বছর চাকরি করলে ফ্ল্যাট কিনলে কি অবৈধ হয়ে যাবে? মায়ের টিআইএন সার্টিফিকেটে নিজের টিআইএন নম্বর বসিয়ে দিয়ে কেন ঋণ দেখানো হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, আসলে এটা হয়তো ভুলে হতেও পারে। একই সঙ্গে নিজের নামে এসব ফ্ল্যাটের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে, নতুন সচিব যোগ দিলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি আট দফা দাবি তুলে ধরেছেন। দাবির মধ্যে- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দপ্তর/শাখা/অধিশাখা/অনুবিভাগে কর্মরত ১০-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ৩ বছর অন্তর অন্তর বদলি/পদায়নের ব্যবস্থা চেয়েছেন। সব মন্ত্রণালয়ে সংস্কার হলেও মন্ত্রিপরিষদে না হওয়ায় দ্রুতই সংস্কার চেয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন বলেন, মন্ত্রিপরিষদে সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছতা থাকবে এবং অন্যদের নিশ্চিত করবে। একেক জায়গায় যুগের পর যুগ থাকবে এটা কারও কাম্য নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights