মানবপাচার রোধে প্রয়োজন পরিকল্পিত পদক্ষেপ

এ কে এম আতিকুর রহমান
গত ২৯ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি লিবিয়া থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছার চেষ্টাকালে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনাকে মর্মান্তিক ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে তাঁদের মৃত্যুর জন্য দায়ী মানব পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন, পাচারচক্র প্রত্যাশী অভিবাসীদের ইউরোপে নেওয়ার মিথ্যা প্রলোভনে ফেলে তাঁদের জীবন সংকটাপন্ন যাত্রার মুখে ঠেলে দেয়। এই অমানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৬ মার্চ গ্রিসে পৌঁছানো এবং সেখানকার একটি ক্যাম্পে থাকা হবিগঞ্জের এক যুবকের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য মতে, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণেই ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা যান।

মৃত ব্যক্তিদের দুই দিন বোটে রেখে পরে তাঁদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। আর যাঁদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের ওই ক্যাম্পে রাখা হয়েছে বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, নৌকাটি পথ হারিয়ে ছয় দিন সাগরে ভাসছিল। মারা যাওয়া ১৮ বাংলাদেশির মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও শাল্লা উপজেলার।

তথ্য মতে, প্রত্যেকেই ১২ লাখ টাকায় লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার জন্য দালালচক্রের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁরা লিবিয়ার উদ্দেশে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। দেখা যায়, প্রতিবছরই লিবিয়া থেকে ইতালি ও গ্রিসগামী এই অনিরাপদ সমুদ্রপথে হাজারো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। তবু থামছে না এই মরণযাত্রা।

বরং এই যাত্রায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বাংলাদেশির সংখ্যা। মানবপাচার রোধে প্রয়োজন পরিকল্পিত পদক্ষেপবলার অপেক্ষা রাখে না যে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ, যারা আর্থিক দৈন্যের মধ্যে বাস করে, তারা প্রায়ই রাতারাতি আর্থিক সচ্ছলতার আশায় লোভের বশবর্তী হয়ে পাচারচক্রের খপ্পরে পড়ে। মানবপাচারের শিকার হওয়ার মূলে রয়েছে দরিদ্রতা, কর্মসংস্থানের অভাব, আয়বৈষম্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, মানবপাচার রোধে প্রয়োজনীয় আইনের প্রয়োগ না থাকা, জনসচেতনতার অভাব, ব্যক্তিগত লোভ ইত্যাদি। এই মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান না করা গেলে মানবপাচার বন্ধ করা কখনোই সম্ভব হয়ে উঠবে না। পাচারকারীরা এই অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে থাকে।

পৃথিবীজুড়েই রয়েছে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। উল্লেখ্য, অনেক সময় বড় ধরনের অপরাধী এবং সন্ত্রাসীরাও এই পাচারচক্রের সাহায্যে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নির্বিঘ্নে সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে।

যে দেশের মানুষ বিদেশে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে ‘যেভাবেই হোক কোনো একটি দেশে ফেলে আসতে পারলেই হলো’ নীতিতে বিশ্বাস করে, সে দেশে মানবপাচার রোধ খুবই কঠিন। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এই মনোভাবের কারণে পাচারকারীরা যেমন অনুপ্রাণিত হয়, পাচারকর্মও তেমনি জোরালো ও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। আত্মসম্মান আর দেশের মান রক্ষা করার বিষয়টি কেন যেন আমাদের অনুভূতিতে তেমন একটা সাড়া জাগাতে পারছে না। এমনকি জীবনের মায়াকে ত্যাগ করে ভিটামাটি বিক্রি বা ধারদেনা করে পাচার হতেও আমরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পাচারচক্রের পেছনে দৌড়াতে থাকি। পাচারকারীরা এতই বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে যে পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা তাদের মিথ্যাকেই সত্য মনে করে, তাদেরকে শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে ভেবে নেয়। আমাদের এ ধরনের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে মানবপাচারের বলয় থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় থাকবে না।

২০২৪ সালের মানবপাচার সংক্রান্ত গ্লোবাল রিপোর্টে বেশ কিছু নীতিগত বিবেচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যেমন—মানবপাচারবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বোঝাপড়ার পরিধি বিস্তৃত করা; ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ ও তাদের সুরক্ষার উন্নতি সাধন করা; মানবপাচারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জোরদার করা; এবং পাচার কার্যক্রম বিস্তারের চালিকাশক্তিগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য মানবপাচার প্রতিরোধে একটি বহুস্তরীয় পদ্ধতি গ্রহণ করা।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের মানবপাচার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্তর ২-এ রয়ে গেছে। প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিকভাবে ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি; যেমন—কমসংখ্যক পাচারকারীর বিরুদ্ধে তদন্ত, বিচার এবং দণ্ডাদেশ প্রদান; শ্রম পরিদর্শকদের অসংগঠিত খাতগুলোকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করার এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের জন্য সংস্থাগুলোকে জবাবদিহি করার সক্ষমতার মারাত্মক অভাব; ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা প্রচেষ্টার অপর্যাপ্ততা (বিশেষ করে প্রত্যাবর্তনকারী বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের জন্য); উচ্চ নিয়োগ ফি, যা অভিবাসী শ্রমিককে ঋণী করে তোলে এবং পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—মানবপাচারে যুক্তদের বিচার প্রচেষ্টা শক্তিশালী করা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, অভিবাসী শ্রমিকদের থেকে নিয়োগ ফি বাতিল, একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, যা পাচারকারীদের বিচার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা প্রচেষ্টার প্রতি গুরুত্ব দেবে ইত্যাদি।

মানব পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক খুব শক্তিশালী এবং বাংলাদেশের আনাচকানাচে এই চক্রের জাল বিস্তৃত। তাই রাতারাতি তা বন্ধ করা কঠিন। সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়া গেলে একা সরকারের পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে মানবপাচার নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক সেগুলো হলো—১. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে কেউ মানবপাচার কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ; ২. লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরে ভিসার প্রকৃতি যাচাই করে (বিশেষ করে পর্যটন বা ব্যবসা ভিসা) ব্যবস্থা গ্রহণ; ৩. অবৈধ অভিবাসন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ; ৪. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান অসাম্য হ্রাস করার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; ৫. দেশের পাচারবিরোধী সব সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি; ৬. পাচারবিরোধী যেকোনো পদক্ষেপের প্রতি সরকার ও জনগণের সক্রিয় সমর্থন এবং সংকট নিরসনের পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া; ৭. পাচার কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কঠোর শাস্তি নিশ্চিতকরণ; ৮. পাচার রোধে সক্রিয় সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ; ৯. পুনর্বাসনসহ ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ দেখভাল নিশ্চিত করা; ১০. আঞ্চলিক ভিত্তিতে পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে একটি যৌথ সহযোগিতা কাঠামো গঠন; ১১. কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি সম্ভাব্য অভিবাসীদের বিদেশে চাকরির নামে যেন পাচার করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখা; ১২. সরকারকে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আন্ত সীমান্ত পাচার নিরসনের জন্য এবং সীমান্তে পাচার চিহ্নিতকরণ ও রোধে যৌথভাবে কাজ করা; এবং ১৩. সরকারি ও বেসরকারি সব সোশ্যাল মিডিয়াকে পাচারমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াসে সংযুক্ত করা।

আরেকটি কথা, ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমস প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে পাচার হওয়া কোনো ব্যক্তিকে বাধ্য হয়ে করা কোনো অপরাধ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার করা, আটক রাখা, মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানো, দণ্ড বা অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া যায় না। কিন্তু দেখা যায়, পাচার হওয়া বাংলাদেশিদেরও অবস্থানরত দেশের আদালত তাঁদের দিয়ে করানো অবৈধ কার্যকলাপ বা অপরাধের জন্য বিচার করে থাকেন। বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে এ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করতে হবে, যদিও মানবপাচারের শিকার হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রমাণ করা খুব সহজ হয় না।

মানবপাচার সারা বিশ্বের সমস্যা এবং সেভাবেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। মানবপাচার বন্ধে আমাদের যেমন আন্তরিক হতে হবে, তেমনি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একদিকে দেশের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মানবপাচার কর্মটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। তাই যারা মানবপাচারের মতো এমন ঘৃণ্য কাজে নিয়োজিত, তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাচারকারী যাতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জানি না বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights