মিয়ানমারে তীব্র লড়াই

বান্দরবান ও টেকনাফ প্রতিনিধি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে টানা কয়েক দিন ধরে আরাকান আর্মি ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। মর্টার শেল ও ভারী গোলা বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কাঁপছে কক্সবাজারের টেকনাফ। পাশাপাশি সেখানে আগুনের কুন্ডলী ও ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এতে সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তের এপার থেকে দাঁড়িয়ে মংডুর বসতিতে জ্বলতে থাকা আগুনের কুন্ডলী দেখা যাচ্ছে। মংডুর অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রায় প্রতিদিন সে দেশের সরকারি বাহিনী, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও রোহিঙ্গারা নৌকা নিয়ে নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে (টেকনাফে) অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ তাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। ফের রোহিঙ্গা ঢলের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন টেকনাফ সীমান্তের মানুষ। টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মংডুতে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। সরকারি বাহিনী সর্বশক্তি দিয়ে মংডু টাউনটির দখল হয়ে যাওয়া অংশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি মংডুতে সরকারি বাহিনীকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়তে সহযোগিতা দিচ্ছে স্থানীয় রোহিঙ্গা। এ কারণে আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে তাদের ঘরবাড়ি দখলে নিচ্ছে। সীমান্তের সূত্রে জানা যায়, চার মাসের বেশি সময় ধরে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে আরাকান আর্মি। ইতোমধ্যে রাচিডং-বুচিডং টাউনশিপসহ দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও সেনাবাহিনীর ২০টির বেশি সীমান্ত চৌকি, ব্যারাকসহ বিপুল এলাকা দখল করে নিয়েছে। মংডু টাউন ও আশপাশের চারটি গ্রাম সিকদারপাড়া, মগনিপাড়া, সুদারপাড়া, ফয়াজিপাড়া এখনো সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। সেখানে সেনা ও বিজিপির দুটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। সীমান্তের একাধিক সূত্রে আরও জানা যায়, মংডু টাউনশিপসহ চারটি গ্রাম দখলে নিতে কয়েক দিন ধরে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে আরাকান আর্মি। অন্যদিকে দখল হয়ে যাওয়া সীমান্ত চৌকি ও ব্যারাক পুনরুদ্ধারে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে সরকারি বাহিনী। তারা রাত-দিন সমানে বিমান হামলা চালিয়ে আরাকান আর্মিকে ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় টেকনাফের অনুপ্রবেশের জন্য নাফ নদে অবস্থান করছিল একটি নৌকা। এতে দেশটির সীমান্তরক্ষী বিজিপির ৪০ সদস্য ছিলেন। পরে তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

এদিকে প্রায় প্রতিদিন রাখাইন রাজ্য থেকে যুদ্ধফেরত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও রোহিঙ্গারা আশ্রিত ক্যাম্পে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এপিবিএনের আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিজিবি কোস্টগার্ড সতর্ক থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় তার প্রভাব এপারের (উখিয়া-টেকনাফে) আশ্রিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও পড়ছে জানিয়ে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ওপারের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য কিংবা রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ওপারের কাউকে আমরা ঢুকতে দেব না।’ টেকনাফ-২ বিজিবির ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। নতুন করে যাতে কেউ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ওপারে মিয়ানমার অংশে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আবারও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম জানান, সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার নম্বর ৪৭ ও ৪৮-এর মধ্যবর্তী আরাকানের বেন্ডুলায় গোলাগুলি এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছি। আরাকান আর্মির (এএ) দখলে থাকা কোনো ক্যাম্প নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য এ হামলা করতে পারে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন রোহিঙ্গা সোলিডারিটি অরগানাইজেশন (আরএসও)। এ ব্যাপারে নাইক্ষ্যংছড়িতে দায়িত্বরত ১১ বিজিবি বা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights