মুছে ফেলা পোস্টে ট্রাম্পের প্রতি নাটালি হার্পের উগ্র আনুগত্যের প্রমাণ
অনলাইন ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হোয়াইট হাউস সহযোগী নাটালি হার্প ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার দিন তার প্রতি গভীর আনুগত্যের প্রকাশ ঘটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫০টিরও বেশি পোস্ট করেছিলেন।
এসব পোস্টে তিনি ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থকদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ট্রাম্পকে পরাজিত করা হয়েছে- তার এই মিথ্যা দাবিও প্রচার করেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের পর্যালোচনায় হার্পের এখন মুছে ফেলা এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের এসব পোস্টের তথ্য উঠে এসেছে। তার অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। তবে কখন এবং কীভাবে অ্যাকাউন্টটি সরানো হয়েছে- হার্প নিজে নাকি প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ পোস্টগুলো সরিয়েছে- তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করা হার্প দীর্ঘদিন ধরেই তার প্রতি আনুগত্যের জন্য পরিচিত। তবে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির পোস্টগুলোতে সেই আনুগত্যের যে প্রকাশ দেখা যায়, তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রকাশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্রন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বি. কোহেন, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন, হার্পের ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, তিনি ট্রাম্পের প্রতি ‘সম্পূর্ণ অনুগত’ এবং ‘তোষামোদকারী’ উপদেষ্টা ও কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কোহেনের মতে, ট্রাম্প এমন ব্যক্তিদের পছন্দ করেন, যারা তাকে প্রশ্ন না করে বরং শ্রদ্ধা ও আনুগত্য দেখান।
হার্প কিংবা হোয়াইট হাউস- কেউই এ বিষয়ে সিএনএনের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
আজ আমরা চুরি বন্ধ করব
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি সকালে ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সমর্থকেরা জড়ো হতে শুরু করলে হার্প তাদের ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে অভিহিত করেন। সে সময় ২৯ বছর বয়সী হার্প ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্কের উপস্থাপক ছিলেন এবং তার টুইটার বায়োতে নিজেকে ট্রাম্পের ‘অ্যাডভাইজরি বোর্ড’-এর সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের পোস্টও তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেন। সেসব পোস্টে বলা হয়েছিল, “এই আন্দোলন কখনও, কোনওদিন শেষ হবে না এবং এই লড়াই মাত্র শুরু হয়েছে।”
ট্রাম্পের ভাষণ শুনতে জড়ো হওয়া সমর্থকদের প্রশংসা করে হার্প আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে তাদের ‘সাহস ও আবেগের সামান্য অংশ’ দেখানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “আজ আমরা চুরি বন্ধ করব- যা ২০২০ সালের নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছ থেকে জয় ‘চুরি’ করা হয়েছে- এই ভিত্তিহীন দাবিরই প্রতিফলন।”
ট্রাম্পের তৎকালীন আইনজীবী রুডি জুলিয়ানির একটি বক্তব্যও হার্প প্রচার করেন। জুলিয়ানি বলেছিলেন, “চলুন, যুদ্ধের মাধ্যমে বিচার হোক।”
পরে জুলিয়ানির আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন, তার বক্তব্যটি ছিল অতিরঞ্জিত বা রূপক অর্থে বলা, সহিংসতার আহ্বান হিসেবে নয়।
ট্রাম্পের জন্য লড়াই করুন
ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসের কাছে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ শুরু করেন, হার্প একটি পোস্টে একই সঙ্গে বহুবার লেখেন, “ট্রাম্পের জন্য লড়াই করুন!” এরপর তিনি লেখেন, “আজ ওয়াশিংটন ডিসি ট্রাম্পের দেশ।”
ট্রাম্পের বক্তব্যও তিনি সরাসরি প্রচার করতে থাকেন। তার পোস্টে ট্রাম্পের বক্তব্যের অংশ হিসেবে উঠে আসে- “আমরা কখনও হাল ছাড়ব না। আমরা কখনও মেনে নেব না।”
এর কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প-সমর্থকদের একটি দল মার্কিন ক্যাপিটলে ঢুকে পড়ে। কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালে হামলা ও তাণ্ডব শুরু হলে হার্প এমন পোস্টও শেয়ার করেন, যেখানে দাবি করা হয়, হামলাকারীরা ট্রাম্পের সমর্থক নয়। একই সঙ্গে তিনি মিথ্যা দাবি ছড়ান যে, বামপন্থী সংগঠন অ্যান্টিফা’র সদস্যরা ওই জনতার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।
পরে অবশ্য হার্প ট্রাম্পের সেই আহ্বানও প্রচার করেন, যেখানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট তার সমর্থকদের ক্যাপিটল ছেড়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিলেন।
ক্যাপিটল হামলার পরও আনুগত্যের প্রচার
ক্যাপিটল হিলে হামলার কারণে কংগ্রেসের নির্বাচনী ফল গণনার প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও হার্প জুলিয়ানির বক্তব্য প্রচার করেন। জুলিয়ানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, এই বাধার ফলে ‘আরও কয়েকটি বিকল্প’ তৈরি হয়েছে এবং ট্রাম্পের আইনজীবীরা কীভাবে সেসব বিকল্প কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে কাজ করছেন।
এরপর অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল ভোট গণনায় আপত্তি জানানো রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে প্রত্যাখ্যাত হলে হার্প লেখেন, “আমেরিকা হয়তো আর আমেরিকা নেই। কিন্তু ঈশ্বর এখনও ঈশ্বর। বিশ্বাস করা বন্ধ করবেন না!”
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি অব্যাহত রাখা আইনপ্রণেতাদেরও হার্প প্রকাশ্যে প্রশংসা করেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি জোডি হাইসকে তিনি ‘নিজের কথা ও সংবিধানের প্রতি অবিচল’ বলে প্রশংসা করেন।
মার্জরি টেলর গ্রিনের ‘সাহসের’ প্রশংসা করেন এবং জশ হাওলিকে ‘সত্যিকারের দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি সংবিধানের প্রতি তার দায়িত্ব পালনের পথ থেকে ভয় দেখিয়ে সরানো যায়নি।
অ্যারিজোনার ইলেক্টোরাল ভোটের আপত্তি বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেওয়া ছয় রিপাবলিকান সিনেটর—টেড ক্রুজ, জশ হাওলি, সিন্ডি হাইড-স্মিথ, জন কেনেডি, রজার মার্শাল ও টমি টিউবারভিলকেও হার্প ‘দেশপ্রেমিক’ বলে অভিহিত করেন। তাদের সম্পর্কে তিনি লেখেন, তারা ‘প্রিয় দেশ ও প্রেসিডেন্টের’ জন্য লড়াইয়ে পিছপা হননি।
নির্বাচনী ‘চুরির’ দাবি আগেই শুরু
ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয় মেনে না নেওয়ার প্রচারণায় হার্পের সক্রিয়তা ৬ জানুয়ারির দিনেই শুরু হয়নি। সিএনএনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির আগের কয়েক সপ্তাহেও তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, “আমরা কখনও হাল ছাড়ব না- কারণ সত্য আমাদের পক্ষে। ৬ জানুয়ারি আসছে!”
২০২০ সালের নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক দিন পর তিনি লিখেছিলেন, “আমরা তোমাকে ভালোবাসি!… ৭ কোটি ১০ লাখ।”
১৪ ডিসেম্বর জো বাইডেনের বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর হার্প লিখেছিলেন, “এটি একটি অভ্যুত্থান।”
পরদিন, ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে নতুন একটি প্রশাসন দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, হার্প তার সেই বক্তব্যও শেয়ার করেন- “আমাদের অবিশ্বাস্য যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে।”
এর মাত্র ১৪ মিনিট পর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে হার্প লেখেন, “আমরা আপনাকে ভালোবাসি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প!”
২০১৬ সাল থেকেই ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য
সিএনএনের পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, ট্রাম্পের প্রতি হার্পের প্রকাশ্য আনুগত্য অন্তত ২০১৬ সাল পর্যন্ত পুরোনো। ওই সময় থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পকে নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করতে শুরু করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১৯ সালে ট্রাম্প অভিশংসনের মুখে পড়ার দিনও হার্প বাইবেলের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাকে সমর্থন করেছিলেন। সেসময় তিনি এমন ভাষায় পোস্ট করেন, যার অর্থ দাঁড়ায়— “হে আমার ঈশ্বর, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে ন্যায়বিচার করুন এবং অবিশ্বস্ত জাতির বিরুদ্ধে তার পক্ষ নিন।”
অন্য একটি পোস্টে তিনি বাইবেলের ভাষা ব্যবহার করে লেখেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প, তোমার কথা স্মরণ করলেই আমি আমার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই।”
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হার্প তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছেন। এতদিন তিনি মূলত আড়ালেই ছিলেন। তবে চলতি সপ্তাহে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ ট্রাম্পের সমালোচনা করে দেওয়া এক বক্তব্যে হার্পের নাম উল্লেখ করার পর তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন।
এরপর বৃহস্পতিবার ডেইলি বিস্ট হার্পের লেখা বলে দাবি করা দুটি চিঠি প্রকাশ করে। ওই চিঠিগুলোতে ট্রাম্পের প্রতি তার অত্যন্ত গভীর আনুগত্যের প্রকাশ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হার্পের মুছে ফেলা পোস্টগুলো এখন প্রকাশ্যে না থাকলেও সিএনএনের পর্যালোচনায় উঠে আসা তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, ট্রাম্পের প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্য সাম্প্রতিক নয়। বরং ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সালের নির্বাচনের পর এবং শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলার দিন পর্যন্ত তার প্রকাশ্য অবস্থানে ট্রাম্পের প্রতি একই ধরনের অটল সমর্থনের ধারাবাহিকতা ছিল। সূত্র: সিএনএন
